ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহ. ও তাঁর ছাত্রদের মতবিরোধ: সংশয় নিরসন

0

ইমাম আবু হানীফা র. ও তাঁর ছাত্রদের মতবিরোধ: সংশয় নিরসন

.

 

আজ এক অবুঝ ভাইকে দেখলাম, সে বলছে- ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রাহ. এক-তৃতীয়াংশ ফতোয়ার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর বিরোধিতা করেছেন। এর মানে ইমাম আবূ হানীফা রা. ভুল ফতোয়া দিয়েছিলেন।

 

📗 জবাব

 

১. এটাকে বিরোধিতা বলে না। বরং মতভিন্নতা, মতবিরোধ, মতানৈক্য, মতভেদ, মতদ্বৈধ ইত্যাদি বলে। সবচেয়ে ভালো ‘ইখতেলাফ’ বলা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘ইলমী মুনাক্বাশা’ও বলা যেতে পারে। মতানৈক তো সাহাবীদের মধ্যেও ছিলো, এর মানে কি তাঁরাও পরস্পর একে অপরের বিরোধিতা করেছেন?

 

২. একজন ইমামের সাথে অন্যজনের মতভিন্নতা মানেই যেকোনো একজনের মত ভুল বা বাতিল- এমনটা ভাবা মূর্খতা। যদি বাতিলই হবে, তাহলে তাদেরই ঘরের (সালাফী) শায়খ ইবনে উসায়মীন, আলবানী ও বিন বায রহ. যে ৪০০ মাছআলার ক্ষেত্রে পরস্পরে বিরোধিতা করেছেন —এর কী হবে? উত্তর দেওয়া হোক, তারা কে ভুল করেছেন আর কে সঠিক করেছেন?

 

৩. চার ইমামসহ অন্যান্য ইমামগণের ইখতিলাফ (মতবিরোধ) বিষয়ে অনেকগুলো কিতাব রচিত হয়েছে, তার মানে কি এক ইমামের মতের সামনে অন্য ইমামের মত বাতিল? আপনি কোনটা বাতিল ধরবেন আর কোনটা সঠিক ধরবেন? আর একজন ইমামের সকল মত সবার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। আপন আপন স্থানে সবাই সঠিক- এটাই আমাদেরকে মানতে হবে।

 

সম্মানিত ইমামগণের মতোবিরোধ সম্পর্কে কয়েকটি কিতাবের বাংলা নাম উল্লেখ করছি-

 

(ক) ইমাম মালেক ও শাফেঈর মধ্যে মতবিরোধ —

(খ) ইমাম মালেক ও তাঁর সাথীদের মধ্যে মতবিরোধ —ইবনে আব্দিল বার্র

(গ) বিজ্ঞ ইমামগণেরর মতবিরোধ —ইবনু হুবায়রাহ

(ঘ) আইম্মাহ’র মতবিরোধে উম্মাহ’র রহমত

(ঙ) ফুকাহায়ে কেরামের মতবিরোধ —ইবনে জারীর তাবারী

(চ) সংক্ষিপ্ত উলামায়ে কেরামের মতবিরোধ —ইমাম তাহাবী

(ছ) ফুকাহায়ে কেরামের মতবিরোধ —মারওয়াযী

(জ) উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ —ইবনু উসায়মীন

 

ইচ্ছে করলে আমি এই বিষয়ে আরো অনেক কিতাবের নাম উল্লেখ করতে পারি; তবে জ্ঞানীদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

 

তাঁরা তাদের কিতাবে ইমামদের মতবিরোধ উল্লেখ করেছেন- কিন্তু কারো মতকে ভুল বা বাতিল বলে আখ্যায়িত করেননি। তো আপনি ভুল বা বাতিল বলার কে? হতে পারে যেটাকে আপনি বাতিল বলছেন সেটাই সঠিক আর যেটাকে সঠিক বলছেন সেটা ভুল।

 

৪. ছাত্র শিক্ষকের সাথে মতবিরোধ করলেই যে শিক্ষকের মত ভুল হয়ে যাবে এটা কেমন উসুল? বরং সাধারণত ছাত্রের জ্ঞান কম হিসেবে ছাত্রের মত ভুল হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত, শিক্ষকের নয়। আর ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ কেবল ইমাম আবু হানীফার সাথে মতবিরোধ করেননি বরং তারা উভয় সাথি পরস্পরেও মতবিরোধ করেছেন, এ ক্ষেত্রে আপনি কাকে সঠিক বলবেন আর কাকে বেঠিক বলবেন?

 

যদি বলেন আবু ইউসুফ বেঠিক- কারণ আবি ইউসুফ মুহাম্মদের সাথী হলেও আবার তাঁর শিক্ষক ছিলেন। আর আপনাদের উসুল যেহেতু ছাত্র শিক্ষক মতবিরোধ হলে শিক্ষকের মত ভুল- সে হিসেবে আবু ইউসুফ এর মত ভুল। তো আবু ইউসুফ এর মত যদি ছাত্রের বিপরীতে ভুল হতে পারে তাহলে শিক্ষক ইমাম আবু হানীফার সাথে মতবিরোধ হলে তো ‘বা-তরীকে আওলা’ ভুল হতে পারে!

 

আর যদি বলেন মুহাম্মদ ভুল করেছে, তবে মুহাম্মদ যদি আবু ইউসুফের সাথে ভুল করতে পারে, তাহলে তাঁর শিক্ষক আবু হানীফার সাথে কেন নয়? মোটকথা, তাঁরা ছাত্র হিসেবে তাঁদের ভুল হতেই পারে।

 

এখন ইমাম আবু হানিফার সাথে মতবিরোধ হলেই যদি বলা হয় যে ইমাম আবু হানিফা ভুল ফতোয়া দিয়েছিল তাই মতবিরোধ করেছেন- এটা তো একটা গাঞ্জাখুরি উসুল। তারা তো ছাত্র হিসেবে কম বুঝের কারণেও মতবিরোধ করতে পারে।

 

গাঞ্জাখুরি উসুল অনুযায়ী- আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মধ্যে মতবিরোধ হলে কেউ যদি বলে আবু ইউসুফ ভুল ফতোয়া দিয়েছিল তাই ইমাম মুহাম্মাদ মতবিরোধ করেছে। আবার কেউ যদি বলে ইমাম মুহাম্মদ ভুল ফতোয়া দিয়েছিল তাই আবু ইউসুফ মতবিরোধ করেছে। ব্যাপারটা কেমন দেখাবে?

 

৫. এবার আসি- মতবিরোধ কেন তৈরি হলো? এ সম্পর্কে সালাফী আলেম সালেহ আল উসায়মীন সুন্দর একটি কিতাব রচনা করেছেন- ‘আলেমগণের মতভেদ: কারণ এবং আমাদের অবস্থান’।

 

তবুও যদি মতবিরোধের জন্য ইমামদেরকে দায়ী করা হয় তবে এর আগে রাসূলের হাদীসকেই দায়ী করা দরকার। (আল্লাহ হেফাযত করুন) কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতবিরোধপূর্ণ হাদীসের কারণেই ইমামদের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।

 

আলহামদুলিল্লাহ। হাদীসের মতবিরোধ সম্পর্কেও ইমামগণ কিতাব রচনা করেছেন। কয়েকটি কিতাবের বাংলা নাম উল্লেখ করছি-

 

(ক) হাদীসের মতবিরোধ —শাফেঈ

(খ) মতবিরোধপূর্ণ হাদীসের ক্ষেত্রে ইনসাফ বজায় রাখা —সিবত ইবনুল জাউযী

(গ) হাদীসের মতভিন্নতা

 

৬. পরিশেষে আমরা একটি আপত্তির জবাব দিবো- তা হচ্ছে ইমাম আবু হানীফার ছাত্রগণ অনেক মাসআলার ক্ষেত্রে তাঁর সাথে মতভিন্নতা করেছেন —এর কারণ কী?

 

📗 জবাব -১

 

প্রত্যেক ইমামের ছাত্ররাই আপন ইমামের সাথে মতভিন্নতা করেছেন। ইমাম মালেক এর সাথে তাঁর ছাত্রদের মতবিরোধপূর্ণ মাসআলা নিয়ে তো আলাদা একটি কিতাবই রচিত হয়েছে- কিতাবটির নাম: ‘ইমাম মালেক ও তার ছাত্রদের মতবিরোধ’। এ কিতাবটি রচনা করেছেন, মালেকী মাযহাবেরই প্রসিদ্ধ ইমাম ইবনে আব্দিল বার্র রহ.

 

📗 জবাব -২

 

আপন ইমামের সাথে ছাত্রদের মতবিরোধ- এটা ইমামের যোগ্যতারই প্রকাশ- কারণ তাঁর ছাত্রদের তিনি এতটা যোগ্য হিসেবে তৈরি করেছেন যে তাঁরা আপন উস্তাদের মতের বিপরীত মত প্রকাশ করার যোগ্যতা ও হিম্মত রাখেন। এর থেকে বোঝা যায় ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. কোনো সাধারণ ও দুর্বল ছাত্রদের শিক্ষক ছিলেন না, বরং যুগের মেধাবী ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেকে সমাসিত করেছেন।

 

📗 জবাব -৩

 

ইমাম আবু ইউসুফ বলতেন, আমরা অনেক সময় হাদীসের বাহ্যিক অর্থের দিকে খেয়াল করে ইমাম আবু হানীফার সাথে মতভিন্নতা করতাম, কিন্তু পরবর্তীতে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতাম যে ইমাম আবু হানীফার মতটাই অধিক সঠিক।

 

📗 উপসংহার

 

তো যাই হোক, ইচ্ছে করলে এ সম্পর্কে আরো অনেক কিছু লেখা যায়। আমাদের ইমামগণ এ বিষয়ে অনেক বড় বড় কিতাব রচনা করেছেন। এবং ইখতিলাফের আদাব সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। সকলের উচিত, সে সমস্ত কিতাব গভীরভাবে অধ্যয়ন করা ও ইমামগণের মতবিরোধ সম্পর্কে স্বচ্ছ-সুস্পষ্ট ধারণা রাখা।

 

লুবাব হাসান সাফওয়ান


56
বিজ্ঞাপনঃ মিসির আলি সমগ্র ১: ১০০০ টাকা(১৪% ছাড়ে ৮৬০)

0

লুবাব হাসান সাফ‌ওয়ান

Author: লুবাব হাসান সাফ‌ওয়ান

লুবাব হাসান সাফ‌ওয়ান। ঠিকানা: নোয়াখালী। কর্ম: ছাত্র। পড়াশোনা: আল-ইফতা ওয়াল হাদীস [চলমান] প্রতিষ্ঠান: মাদরাসাতু ফায়দ্বিল 'উলূম নোয়াখালী।

নিচের লেখাগুলো আপনার পছন্দ হতে পারে

কবিতা আল কোরআনের প্রতীক আফছানা খানম অথৈ

আল কোরআনের প্রতীক আফছানা খানম অথৈ মা আমেনার গর্ভেতে জন্ম নিলো এক মহামানবের, নাম হলো তার মুহাম্মদ রাসুল আসলো ভবের

ফোরাত নদীতে স্বর্নের পাহাড় আফছানা খানম অথৈ

ফোরাত নদীতে স্বর্নের পাহাড় আফছানা খানম অথৈ ইমাম মাহাদী (আ:) আগমনের পূর্বে ফোরাত নদীর তীরে স্বর্নের পাহাড় ভেসে উঠা কেয়ামতের

কবিতা দাজ্জাল আফছানা খানম অথৈ

দাজ্জাল আফছানা খানম অথৈ কেয়ামতের পূর্বে দাজ্জাল আসবে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে, কাফের মুনাফিক যাবে তার দলে ঈমানদার মুমিন

গল্প হযরত মুহাম্মদ (সা:) জীবনের গল্প আফছানা খানম অথৈ

জন্ম:হযরত মুহাম্মদ (সা:) বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ গোত্রে বনি হাশিম বংশে ৫৭০ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন।তার পিতার

Leave a Reply