হযরত আদম (আ.) এর জীবনী

হযরত আদম (আ.) জীবনী

1

বিশ্বের সকল আহলে কিতাবের অনুসারীদের মতে, হযরত “আদম” (আ.)-ই হচ্ছেন এই পৃথিবীর প্রথম মানব। পবিত্র কুরআনেও সর্বপ্রথম হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ রয়েছে। পুরো পৃথিবীর আদি পিতা আদম (আ.) কেমন ছিলেন, কীভাবে তাঁর জন্ম, কী তাঁর সন্তানাদি এবং পরিবার পরিজন, ইত্যাদি জানতে হলে আপনাকে অবশ্যই এই আর্টিকেলটি শেষ করতে হবে। আজ আমরা খুবই সংক্ষিপ্ত কিছু টপিকের উপর হযরত আদম (আ.) এর জীবনী জানার চেষ্টা করব। 

আদম (আ.) এর জন্ম

শুরুতেই আমরা জানব, কীভাবে এবং কখন আদম এর জন্ম কিংবা তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেহেতু আদম (আ.) কে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও মেনে চলে। সেহেতু তাঁকে নিয়ে নানান কাহিনী বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য কিতাবেও পাওয়া যায়। আজ আমরা শুধুমাত্র কুরআন এবং হাদিসের আলোকেই হযরত আদমের জন্ম সম্পর্কে জানবো।

আল্লাহ তাঁর প্রতিনিধি সৃষ্টি করবেন

আমরা পবিত্র কুরআন থেকে জানতে পারি, তিনি ফেরেশতাদের জানাচ্ছেন যে, আল্লাহ পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি পাঠাতে চান। এ কথা কুরআনে এভাবে বর্ণনা হয়েছে, 

“আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, (সুরা: আল বাকারা, আয়াত: ৩০)

অর্থাৎ আল্লাহ চাইছেন, তিনি এমন কাউকে দুনিয়ায় পাঠাবেন, যারা সেখানে গিয়ে সন্তানাদিসহ বসবাস করে বংশবিস্তার করবে। এই কথা শুনে ফেরেশতাগণ বলল,

“তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে ফাসাদ করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে? আর আমরা তো আপনার প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (সুরা: আল বাকারা, আয়াত: ৩০)

অর্থাৎ যেখানে ফেরেশতাগণ প্রতিনিয়তই আল্লাহর গুণকীর্তন তথা তাসবিহ পাঠ  করছে, সেখানে কেন এই নব্য মানবজাতির প্রয়োজন? যারা পৃথিবীতে যাওয়া মাত্রই দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ যাবতীয় অনর্থক হিংসাত্মক হিংস্রতা সৃষ্টি করবে। তার চেয়ে আমরা (ফেরেশতারা) কি আপনার কম বন্দনা করছি? 

ফেরেশতাদের কথায় আল্লাহ শুধু এইটুকুই বললেন,

“নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না।” (সুরা: আল বাকারা, আয়াত: ৩০)

অর্থাৎ আল্লাহ কেন মানুষ সৃষ্টি করছেন সেটা তাঁর চেয়ে অধিক কেউই জানে না। এভাবেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে,  তিনি পৃথিবীতে মানুষ পাঠাবেন। আর পৃথিবীর প্রথম মানুষ হচ্ছে আদম। যাকে আল্লাহ মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন। 

মাটি থেকে আদম

আল্লাহ যখন পৃথিবীর মাটি দিয়ে আদম (আ.) কে বানাতে ইচ্ছা করলেন। তখন তিনি জিবরাঈল (আ.) কে পৃথিবীতে গিয়ে  মাটি আনতে বললেন। কিন্তু তিনি মাটি নিতে গেলে পৃথিবী বলে,

“তোমার হাত থেকে আমার মাটির পরিমাণ হ্রাস হওয়া কিংবা বিকৃতি হওয়া থেকে আমি মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” একথা শুনে জিবরাঈল (আ.) মাটি না নিয়েই ফিরে গিয়ে আল্লাহকে বললেন, “হে আল্লাহ,  পৃথিবী আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছে।” 

এরপর আল্লাহ মিকাইল (আ.) কে একই কাজে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠালেন। এবং তিনিও একইভাবে পৃথিবীর কাছ থেকে ফিরে গেলেন। অতঃপর আল্লাহ মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাইল (আ.) কে মাটি আনতে পাঠালে, তাকেও পৃথিবী একই কথা বলে ফিরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু আজরাইল (আ.) অন্যদের মতো খালি হাতে ফিরে গেলেন না। তিনি  বললেন,

আমিও আল্লাহর আদেশ মান্য না করে ফিরে যাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” এরপর তিনি পৃথিবীর সব জায়গা থেকে মাটি নিয়ে আল্লাহর কাছে গেলেন। এই ঘটনাটি সাহাবী ইবনে মাস’উদসহ আরও কিছু  সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত আছে বলে আলেম উলামারা বলে থাকেন।

ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, আল্লাহ মাটি দিয়ে আদম (আ.) কে মানুষের আকারে রূপ দেওয়ার পর তিনি তা মাটির আকারেই রেখে দিলেন। এরপর আল্লাহ সেই শরীরে তাঁর রুহ দিলেন। এভাবেই আল্লাহ আদম (আ.) কে সৃষ্টি করলেন। 

আদম (আ.) এর ভাষা কি ছিল

অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, আদম এর যদি একটি ভাষাতেই কথা বলতো, তাহলে পৃথিবীতে এতগুলো ভাষা কীভাবে এলো? তাদের দাবি যৌক্তিক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। আল্লাহ আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পরই তাঁকে এই পৃথিবীর উপযোগী করতে বিভিন্ন ভাষাসহ এই দুনিয়ার যাবতীয় জ্ঞান দান করেছেন। পবিত্র কুরআনে এই জ্ঞান দানের কথা এভাবে এসেছে,

আর আল্লাহ তা’আলা শিখালেন আদম (আ.) কে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম।” (সুরা: আল বাকারা, আয়াত: ৩১)” 

অর্থাৎ আল্লাহ হযরত আদম (আ.) কে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত যাবতীয় জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে কবীরে বলা হয়েছে, আদম (আ.) কে সমস্ত বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও অবস্থাদি বর্ণনা করা হয়েছে এবং শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। এ থেকে এটাই আজ প্রমাণিত যে, পৃথিবীতে যতগুলো ভাষা আজ প্রচলিত, তার সবগুলোই আল্লাহ আদম (আ.) কে শিখিয়ে দিয়েছেন। যা আজ আদম সন্তানেরা আরবি ফার্সি ইংরেজি ইত্যাদি ভাষায় ব্যবহার করে আসছে।

তাফসিরে আবুস সাউদে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় এসেছে, “কারো মতে আদম (আ.) কে অতীত ও ভবিষ্যতের সমস্তু বিষয়াদির নাম আল্লাহ শিখিয়েছিলেন। ইন্দ্রিয়াতীত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কাল্পনিক ও খেয়ালি বেখেয়ালী সবকিছুই শিক্ষা তিনি আল্লাহ থেকে পেয়েছেন। সব কিছুর সত্তাগত নাম বৈশিষ্ট্য পরিচিতি জ্ঞান এবং  বিদ্যার নিয়মাবলিসহ পেশা ও কারিগরি নীতিমালাসহ এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির  বিস্তারিত বর্ণনাসহ সেগুলোর ব্যবহার প্রণালীও আদম (আ.) কে অবহিত করা হয়েছিল। 

এভাবে প্রতিটি তাফসিরের বর্ণনা অনুযায়ী বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ আদম (আ.) কে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত যাবতীয় ভাষা ও জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে আদম শুধু একটি নির্দিষ্ট ভাষা নয়, বরং যাবতীয় ভাষাই তিনি জানতেন। যা পরবর্তীতে তাঁর আগত সন্তানেরা ব্যবহার করছে। 

আদম হাওয়া জীবনী

আল্লাহ মানুষ হিসাবে প্রথমে আদম (আ.) কে ই তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মা হাওয়া কে তৈরি করেন। এই বিষয়ে ইমাম তাবারি (রহ.) বর্ণনা করেন, আদম (আ.)-কে যখন বেহেস্তে থাকতে দেওয়া হয়। তখন সেখানে তিনি একাকী উদাস ও আনমনা হয়ে থাকতেন। তিনি ছাড়া সেখানে দ্বিতীয় কেউ ছিলো না। বা  তাঁর কোনো স্ত্রী সন্তান ছিল না, যার কাছে তিনি প্রশান্তি পেতে পারেন। 

এভাবে তিনি একদিন ঘুমালেন এবং ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখলেন যে, তাঁর মাথার কাছে একজন রূপসী নারী বসে আছেন। আল্লাহ সেই রূপসীকে তাঁর পাঁজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আদম (আ.) এই নারীকে দেখে জানতে চাইলেন, তুমি কে? তখন সেই নারী উত্তর দিলেন, আমি একজন নারী। আদম বললেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? হাওয়া উত্তর দিলেন, যেন আপনি আমার কাছে প্রশান্তি লাভ করেন।’ (তাফসিরে তাবারি)

এভাবেই আদম হাওয়া একে অপরের সাথে পরিচিত হয়। এবং তারা জান্নাতে হেসেখেলে দিন পার করতে লাগলো। যা ইবলিশ শয়তানের মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না। কেননা শয়তান আদমের জন্মগত শত্রু। এই আদম (আ.) কে সিজদা না করার কারণে আল্লাহ শয়তানকে অভিশপ্ত করেছে। যে কারণে সে লক্ষ হাজার কোটি ইবাদত করার পরও আল্লাহর কাছে নিগৃহীত। তাই যে আদমের কারণে সে অভিশপ্ত, সেই আদম (আ.) কেই সে আল্লাহর চোখে অপরাধী করার কাজে নিয়োজিত।

এদিকে আল্লাহ আদম (আ.) কে তাঁর সাথী দিয়েই একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। আর তা হলো, তোমাকে তোমার সাথী দিয়েছি, তোমরা ইচ্ছামতো জান্নাতের এই বাগানে হেসেখেলে বেড়াও। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কখনোই ঐ গাছের ধারেকাছেও যাবে না। যদি এমনটা করো, তাহলে তোমাদের রক্ষা নাই।

আদম আল্লাহর কথা শুনে তেমন রিঅ্যাক্ট দেখালো না। কেননা এই বাগানে যা আছে তা খেয়েই কোনো কিছু শেষ হয় না। সেখানে খামোখা ঐ গাছের কাছে যাওয়ার দরকারই বা কী? তাই তারা খুব আনন্দে দিন কাটাতে লাগলো। 

তাদের আনন্দ দেখে শয়তানের পিত্তি জ্বলে উঠে। সে মনে মনে ভাবে, তুই আদম আমার সব কেড়ে নিয়েছিস। মান সম্মান ইবাদত আমল কিছুই আর বাকি নেই। এমনকি আমি বাকি জিন্দেগী ইবাদত বন্দেগী করলেও তা আল্লাহ আর কবুল করবেন না। তাই আমি যখন বরবাদই হয়েছি, তাহলে তোদের নিয়েই বরবাদ হবো।

যে ভাবা সেই কাজ। সে খুবই ভালো মানুষ সেজে আদমের কাছে গিয়ে নানান তাল বাহানা দিতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তাকে শপথ করে বলল, তুমি কি জান কেন আল্লাহ এই গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন? আদম জবাব দিল, আমি তো জানি না। আচ্ছা আদম তুমি জানো আমরা ফেরেশতারা অমরণশীল। অর্থাৎ কিয়ামতের আগে আমাদের মৃত্যু নেই। কিন্তু তোমাদের তো মৃত্যু আছে। আর আল্লাহ এই গাছে এমন কিছু রেখেছেন, যা কেউ খেলে সেও অমরত্ব লাভ করবে। তাই তোমাদের এই গাছের দিকে যেতে নিষেধ করেছেন। 

এইভাবে শয়তান নানান ফন্দি ফিকির করে আদম হওয়াকে ঐ গাছের ফল খেতে উৎসাহ দেয়। এমনকি সে আল্লাহর নামেও শপথ করে! তার এই ধোঁকাবাজির শপথ দেখে আদম হাওয়া গলে যায়।

আর এভাবেই তারা শয়তানের ফাঁদে পা দেয়। এই ফাঁদে পা দেওয়ার সাথে সাথেই তারা আল্লাহর কাছে পাপিষ্ঠ হয়ে পড়ে। তাই আল্লাহ তাদের দ্রুতই জান্নাত থেকে বের করে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেন। 

কুরআনের বর্ণনা মতে আদম ও হাওয়া উভয়েই জান্নাতের  বাগানের নিষিদ্ধ ফলটি খেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তাঁদের দুজনকেই বেহেশত থেকে তাড়িয়ে দিয়ে  আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এবং তারা প্রত্যেককে আলাদা উপত্যকায় পাঠানো হয়। 

কিছু কিছু ইতিহাসবিদের বর্ণনায়  আদম (আ.) কে আল-সাফা উপত্যকায় এবং হাওয়াকে আল-মারওয়া উপত্যকার চূড়ায় নামানো হয়। 

এরপর তারা উভয়ে আল্লাহর কাছে তাদের কৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকে। একপর্যায়ে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিলে, তারা পরস্পরের মিলিত হয়ে দুনিয়ায় সংসার করতে থাকে। কোরআন হাদিসের সূত্র  থেকে জানা যায়, আদম ও হাওয়া (আ.) জান্নাতে থাকা অবস্থায়  কোনো সন্তান লাভ করেননি। পৃথিবীতে আসার পর তারা সন্তান লাভ করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১/১৯৮)  এভাবেই তারা দুনিয়ায় সংসার করে সন্তান সন্ততি জন্ম দান করেন। 

আদম (আ.) এর সন্তান সন্ততি

আমাদের আদি পিতা আদম (আ.)-এর অসংখ্য সন্তান সন্ততি থাকলেও তাদের মধ্যে শুধু তিনজনের নাম কোরআন ও হাদিসে এসেছে। আর তারা হচ্ছেন  হাবিল, কাবিল ও শিস (আ.)। কোরআনে কাবিলের হাতে হাবিল নিহত হওয়ার ঘটনা এভাবে বলা হয়েছে যে,

আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা ভয়েই কিছু উৎসর্গ নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের উৎসর্গ গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের গৃহীত হয়নি। সে বললঃ আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বললঃ আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন।” (সুরা: আল মায়িদাহ, আয়াত: ২৭)

এছাড়াও আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, কিছু কিছু ইতিহাসবিদ আদম এবং মা হাওয়ার সন্তান সংখ্যা বিশ কিংবা চল্লিশ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এর সঠিক সংখ্যা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

আদম (আ.) এর কবর কোথায়

প্রতিটি নবি রাসুল হচ্ছেন মানুষের জন্য  অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাই রাসুলদের জীবন-মৃত্যু নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কৌতূহল থাকে। ঠিক তেমনি কোন নবির কবর কোথায় তা নিয়েও মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। তবে এটা সুনিশ্চিত যে, রাসুল (সা.) এর কবর ছাড়া, আর কোনো নবি রাসুলের কবরই কেউ শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না।

তাই অধিকাংশ সালফে সালেহীনদের অভিমত হচ্ছে, নবি রাসুলদের কবরের অনুসন্ধান না করা। কেননা এতে ধর্মীয় কোনো কল্যাণ নেই। এবং তা সংরক্ষণ করাও ইসলামের অংশ নয়। যদি তাদের কবরে দ্বীনের কোনো উপকার হতো, তাহলে আল্লাহই তা সংরক্ষণ করতেন। অথচ যারা এগুলো অনুসন্ধান করে তাদের অধিকাংশের উদ্দেশ্য হলো সেখানে নামাজ আদায় করা, দোয়া করা, মানত করা। যা শিরক বিদআতের অংশ এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : ২৭/৪৪৪)

শুধু তাইনয় অধিকাংশ দাবিকৃত নবি রাসুলের কবর গুলো সম্পূর্ণ ভীত্তিহীন। শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) বলেন, ‘আমাদের নবি (সা.) এর কবর ছাড়া আর কোনো নবির কবর সম্পর্কে জানা যায় না। যারা ‘ওমান’ বা অন্য কোনো স্থানে কোনো নবির কবর হওয়ার দাবি করে সে মিথ্যাবাদী। তবে ফিলিস্তিনে ইবরাহিম (আ.) এর কবরের স্থান সম্পর্কে জানা যায়। অন্য নবিদের কবর সম্পর্কে জানা যায় না।’ (নুর আলাদ-দারবি, শারিত : ৬৪২)

একইভা‌বে  আদম (আ.)-কে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। জনশ্রুতি আছে তিনটি প্রসিদ্ধ জায়গায় তাঁর কবর আছে। যার একটি হলো, ভারতবর্ষের যে পাহাড়ে তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আরেকটি হলো মক্কার জাবালে আবু কুবাইস এবং অন্যটি হলো, বায়তুল মুকাদ্দাস। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর এক হাদিসের বর্ণনায় এসেছে মৃত্যুর সময় তাঁর  বয়স হয়েছিল এক হাজার বছর। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১/১২৬-১২৯)। 

তবে আদম (আ.) এর সত্যিকারের কবর কোথায় তা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না। যারা বিভিন্ন জায়গায় আদম (আ.) এর কবর আছে বলে দাবি করে, তাদের দাবির পক্ষে কোনো সঠিক শক্তিশালী  গ্রহণযোগ্য কোনো দলিল নেই। তবে এ ব্যাপারে কিছু অগ্রহণযোগ্য মতামত পাওয়া যায়। যেমন সুনানে দারাকুতনির সূত্রে বর্ণিত আছে, ‘জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদুল খায়ফে আদম (আ.) এর জানাজা নামাজ পড়েন।’ আল্লামা ইবনে আসাকি (রহ.) এই বর্ণানি গ্রহণ করেননি। (আদ-দুর আল-মানসুর : ৩/৩৩৪)

এছাড়াও কিছু কিছু মুসলমান ওমানের একটি কবরের মতো লম্বা স্থান কে আদম (আ.) এর কবর বলে চালিয়ে দেন। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় সময়ই ভাইরাল হয়। মূলত এই লম্বা করবটি হযরত ইমরান এর কবর। যা ওমানের সালালাহ শহরে অবস্থিত। এই বিষয়ে ওমানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল ওমান টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০১৮ সালের ১২ আগস্টে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। 

আদম আ. এর দোয়া

আল্লাহ আদম ও হাওয়া আ. কে বেহেশতে থাকার সময় শর্ত দিয়েছিল যে, একটি নিষিদ্ধ গাছের ফল না খেতে। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তাঁরা তা খেয়ে ফেলে। তখন শর্ত মোতাবেক আল্লাহ তাঁদের দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন আলাদা করে। এই কঠিন সময়ে তাঁরা উভয়ই দুনিয়ার বুকি একটি দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। যে দোয়াটি আল্লাহ নিজেই তাদের শিখিয়ে দিয়েছিলেন। যাকে কুরআনের ভাষায় ক্ষমা লাভের দোয়া বলা হয়। এই দোয়াটি হলো, সুরা আরাফের ২৩ নং আয়াত। যার উচ্চারণ, 

“রাব্বানা  যালামনা আংফুসানা ওয়া ইললাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন। (সুরা আরাফ : আয়াত ২৩)

অর্থ: তারা উভয়ে বললঃ হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। (সূরা: আল আ’রাফ, আয়াত: ২৩)

আদম (আ.) এর সন্তানদের নামের তালিকা

ইসলামের ইতিহাসে আদম (আ) এর সন্তান-সন্তুতির আলোচনা তেমন নেই। রাসুল (সা.) এবং সাহাবীদের (রা.) থেকে এই বিষয়ে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া না। তবে আহলে কিতাবিদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। যা বিশ্বাস করা উচিত না হলেও, জানার জন্য বর্ণনা করছি।

এব্যাপারে কথিত তাওরাতের (বাইবেলের) উদ্ধৃতি উল্লেখ করা ইবনে  কাছীর (রহ.) বলেন। শিস (আ.) এর জন্মের সময় আদম (আ.) এর বয়স ছিল ১৩০ বছর। তারপর তিনি আরও প্রায়  ৮০০ বছরকাল জীবিত ছিলেন। তাঁর ১৬৫ বছর বয়সে তাঁহ পুত্র আনুশের জন্ম হয়। তারপর তিনি আরও ৮০৭ বছর জীবিত ছিলেন। আনুশের ৯০ বছর বয়সে তাঁর পুত্র কীনানের জন্ম হয়। তারপর আনুশ আরও ৮১৫ বছরকাল জীবিত ছিলেন। কীনানের ৭০ বছর বয়সে তাঁর পুত্র মালাঈলের জন্ম হয়। তারপর কীনান আরও ৮৪০ বছরকাল জীবিত ছিলেন। মাহলাইলের ৬৫ বছর বয়সে তার পুত্র আরদ-এর জন্ম হয়। তারপর মাহলাঈল আরও ৮৩০ বছর জীবিত ছিলেন। যার ১৬২ বছর বয়স হলে তারপুত্র খানূখ জন্মগ্রহণ করেন।

পাঠকদের প্রশ্নের উত্তরঃ

আদম (আ.) এর সন্তান কত জন?

আদম (আ.) এর কতজন সন্তান ছিলেন, সে বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ নেই। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের দুটি মত পাওয়া যায়। যার একটি হচ্ছে, ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির (রহ.) মত। তাঁর মতে  হাওয়া (আ.) তাঁর জীবনে বিশবার গর্ভধারণ করে এবং প্রতিবারে দুটি করে মোট চল্লিশটি সন্তান জন্ম দেন। প্রত্যেকবারই একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করত। সন্তানদের মধ্যে প্রথম জোড়ায় ছিল কাবিল ও তার বোন ইকলিমা, আর শেষ জোড়ায় ছিল আবদুল মুগিস ও তার বোন উম্মুল মুগিস।’ (নবুওয়াতু আদম ওয়া রিসালাতুহু, পৃষ্ঠা ১১৫)

উপরোক্ত মত ছাড়াও কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, হাওয়া (আ.) ১২০ বার গর্ভধারণ করে সন্তান প্রসব করেন।  এবং প্রতিবারই দুটি সন্তান জন্ম নিতো। যার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হতো। ঐতিহাসিকদের অনুমান হচ্ছে, আদম (আ.) জীবিত থাকা অবস্থাতেই তাঁর সন্তান ও পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার লাখে পৌঁছে যায়। (মুজাজুত-তারিখিল ইসলামী : ২/১৩)

আদম (আ.) এর উচ্চতা কত ছিলো

আদম আ. এর উচ্চতা ছিলো ষাট হাত লম্বা। এটা আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ বর্ণনা করেন। রাসুল (সা.) বলেন” আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) সৃষ্টি করেছেন এই অবস্থায় যে তার উচ্চতা ছিল ষাট হাত। ………… অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তি যে জান্নাতে প্রবেশ করবে আদমের আকৃতিতেই হবে। অতঃপর সৃষ্টি এভাবেই খাটোই হচ্ছে এখন পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী ইফাঃ হাদিস নং ৩০৯১)

 

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী

পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। 

 

আরো পড়ুন-

 


56
বিজ্ঞাপনঃ মিসির আলি সমগ্র ১: ১০০০ টাকা(১৪% ছাড়ে ৮৬০)

1

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী

Author: সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী জন্ম চট্টগ্রামে। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় প্রবাসী ছিলেন। প্রবাসের সেই কঠিন সময়ে লেখেলেখির হাতেখড়ি। গল্প, কবিতা, সাহিত্যের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলা পত্রিকায়ও নিয়মিত কলাম লিখেছেন। প্রবাসের সেই চাকচিক্যের মায়া ত্যাগ করে মানুষের ভালোবাসার টানে দেশে এখন স্থায়ী বসবাস। বর্তমানে বেসরকারি চাকুরিজীবী। তাঁর ভালোলাগে বই পড়তে এবং পরিবারকে সময় দিতে।

নিচের লেখাগুলো আপনার পছন্দ হতে পারে

কবিতা আল কোরআনের প্রতীক আফছানা খানম অথৈ

আল কোরআনের প্রতীক আফছানা খানম অথৈ মা আমেনার গর্ভেতে জন্ম নিলো এক মহামানবের, নাম হলো তার মুহাম্মদ রাসুল আসলো ভবের

ফোরাত নদীতে স্বর্নের পাহাড় আফছানা খানম অথৈ

ফোরাত নদীতে স্বর্নের পাহাড় আফছানা খানম অথৈ ইমাম মাহাদী (আ:) আগমনের পূর্বে ফোরাত নদীর তীরে স্বর্নের পাহাড় ভেসে উঠা কেয়ামতের

কবিতা দাজ্জাল আফছানা খানম অথৈ

দাজ্জাল আফছানা খানম অথৈ কেয়ামতের পূর্বে দাজ্জাল আসবে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে, কাফের মুনাফিক যাবে তার দলে ঈমানদার মুমিন

গল্প হযরত মুহাম্মদ (সা:) জীবনের গল্প আফছানা খানম অথৈ

জন্ম:হযরত মুহাম্মদ (সা:) বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ গোত্রে বনি হাশিম বংশে ৫৭০ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন।তার পিতার

Leave a Reply