তেল শোধনাগার বা পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি (ইংরেজি: Oil refinery) হলো একটি বিশাল শিল্প কারখানা, যেখানে অপরিশোধিত তেল (Crude oil) পরিশোধন করে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় এবং ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন করা হয়। এটি পেট্রোলিয়াম শিল্পের ডাউনস্ট্রিম (Downstream) খাতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাটি বা সমুদ্রের তলদেশ থেকে উত্তোলিত অপরিশোধিত তেল সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়; তাই এটিকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করা অপরিহার্য।
উৎপাদিত পণ্য
অপরিশোধিত তেল মূলত বিভিন্ন হাইড্রোকার্বনের একটি জটিল মিশ্রণ। শোধনাগারে রাসায়নিক ও তাপীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মিশ্রণ থেকে নানা ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য আলাদা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
পেট্রোল (গ্যাসোলিন) ও অকটেন
-
ডিজেল ও কেরোসিন
-
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG)
-
জেট ফুয়েল (বিমানের জ্বালানি)
-
লুব্রিকেন্ট বা পিচ্ছিলকারক তেল
-
অ্যাসফল্ট বা বিটুমিন (রাস্তা তৈরির উপাদান)
কার্যপ্রণালী
একটি তেল শোধনাগারে অপরিশোধিত তেলকে মূলত তিনটি প্রধান ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়: ১. পৃথকীকরণ (Separation): আংশিক পাতন (Fractional distillation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলকে উচ্চতাপে ফুটিয়ে এর বিভিন্ন উপাদানকে স্ফুটনাঙ্কের (Boiling point) ওপর ভিত্তি করে আলাদা করা হয়। ২. রূপান্তর (Conversion): কম চাহিদার ভারী হাইড্রোকার্বনগুলোকে ‘ক্র্যাকিং’ (Cracking) বা ‘রিফর্মিং’ প্রক্রিয়ায় ভেঙে বেশি চাহিদাসম্পন্ন হালকা জ্বালানিতে (যেমন- পেট্রোল বা অকটেন) পরিণত করা হয়। ৩. পরিশোধন (Treating): উৎপাদিত পণ্য থেকে সালফার, নাইট্রোজেন এবং অন্যান্য ক্ষতিকর অপদ্রব্য দূর করে সেগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও ইঞ্জিন-উপযোগী করা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সাম্প্রতিক অবস্থা
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল শোধনাগারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার হলো ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ (ERL), যা চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এবং ১৯৬৮ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনা: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট জটিলতার কারণে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে (১৪ এপ্রিল, ২০২৬)। ‘ডেড স্টক’ ফুরিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে উৎপাদন স্থগিত করা হলেও, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মতে দেশে পরিশোধিত তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় এবং চাহিদার সিংহভাগ সরাসরি আমদানি হওয়ায় বাজারে জ্বালানি সংকট সৃষ্টির কোনো আশঙ্কা নেই। আশা করা হচ্ছে, আগামী মে মাসের শুরুতে সৌদি আরব থেকে নতুন চালান পৌঁছালে শোধনাগারটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে।
পরিবেশগত প্রভাব
তেল শোধনাগার বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর পরিবেশগত প্রভাব ব্যাপক। শোধনাগার থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুতে নির্গত হয়, যা বায়ু দূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ। এছাড়া বর্জ্য রাসায়নিক পদার্থ পানি ও মাটি দূষণ ঘটাতে পারে। আধুনিক শোধনাগারগুলোতে কার্বন ক্যাপচার এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির মাধ্যমে এই দূষণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।