ইহুদি ধর্মগ্রন্থ বা ইহুদি সাহিত্য বলতে ইহুদি ধর্মের বিশ্বাস, আইন, ইতিহাস, দর্শন, নীতিশাস্ত্র এবং রহস্যবাদের ওপর ভিত্তি করে রচিত পবিত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থাবলিকে বোঝায়। ইহুদি ধর্ম মূলত একটি গ্রন্থ-ভিত্তিক ধর্ম, যেখানে ঈশ্বরের বাণী, ঐতিহাসিক বিবরণ এবং রাব্বিদের (ইহুদি পণ্ডিত) আইনি ও দার্শনিক আলোচনা অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র এবং প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো তানাখ (হিব্রু বাইবেল), যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তোরাহ (Torah)।
তবে ইহুদি ধর্ম কেবল লিখিত তোরাহর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এর পাশাপাশি ‘মৌখিক তোরাহ’ বা রাব্বিনীয় সাহিত্য, যেমন— মিশনাহ, তালমুদ, মিদরাশ এবং অন্যান্য হালাখীয় (আইনগত) গ্রন্থও ইহুদি ধর্মীয় জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইহুদি ধর্মগ্রন্থগুলোকে সাধারণত কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: তানাখ (লিখিত আইন), রাব্বিনীয় সাহিত্য (মৌখিক আইন), হালাখা (আইন সংহিতা), কাব্বালাহ (রহস্যবাদী গ্রন্থ) এবং লিটার্জি বা প্রার্থনা গ্রন্থ। নিচে এই প্রতিটি বিভাগের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. তানাখ (হিব্রু বাইবেল)
তানাখ (হিব্রু: תַּנַ”ךְ) হলো ইহুদিদের মূল ধর্মগ্রন্থ। খ্রিষ্টান ধর্মে এটিকে ‘পুরাতন নিয়ম’ (Old Testament) হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও, ইহুদিরা এটিকে তানাখ বা হিব্রু বাইবেল বলে থাকে। ‘তানাখ’ শব্দটি মূলত তিনটি হিব্রু শব্দের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত একটি অ্যাক্রোনিম, যা বাইবেলের তিনটি প্রধান অংশকে নির্দেশ করে:
-
ত (T): তোরাহ (Torah) বা আইন/উপদেশ।
-
ন (N): নেভিইম (Nevi’im) বা নবীগণ।
-
খ (Kh): কেতুভিম (Ketuvim) বা রচনাবলি।
তানাখে মোট ২৪টি পুস্তক রয়েছে (খ্রিষ্টান বাইবেলে এই পুস্তকগুলোকে ভেঙে ৩৯টি পুস্তকে ভাগ করা হয়েছে, তবে মূল পাঠ একই)।
১.১ তোরাহ (Torah)
‘তোরাহ’ শব্দের অর্থ হলো ‘নির্দেশনা’, ‘শিক্ষা’ বা ‘আইন’। এটি তানাখের প্রথম এবং সবচেয়ে পবিত্র অংশ, যা পাঁচটি পুস্তক নিয়ে গঠিত। একে ‘পঞ্চপুস্তক’ (Pentateuch) বা ‘মোশির পাঁচটি বই’ (Five Books of Moses)-ও বলা হয়। ইহুদি বিশ্বাস অনুযায়ী, সিনাই পর্বতে ঈশ্বর (যিহোবা বা ইয়াহওয়েহ) নবী মোশির (Moses) কাছে সরাসরি তোরাহ অবতীর্ণ করেছিলেন। তোরাহর পাঁচটি পুস্তক হলো:
১. আদিপুস্তক (Genesis / ব্রেয়েশিত): এটি তোরাহর প্রথম বই। এতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, প্রথম মানব আদম ও হাওয়ার (ইভ) গল্প, নূহের (নোয়াহ) মহাপ্লাবন এবং বাবেল টাওয়ারের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এরপর এটি ইহুদি জাতির আদি পিতা আব্রাহাম (ইব্রাহিম), আইজ্যাক (ইসহাক) এবং জ্যাকব (ইয়াকুব/ইসরায়েল)-এর জীবন এবং জোসেফের (ইউসুফ) মিশরে যাওয়ার কাহিনি নিয়ে আলোচনা করে।
২. যাত্রাপুস্তক (Exodus / শেমোত): এই বইয়ে বনী ইসরায়েলের মিশরে দাসত্ব, মোশির জন্ম ও ঈশ্বর কর্তৃক তাঁর মনোনয়ন, মিশরের দশটি মহামারী, লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে মিশর থেকে পলায়ন (Exodus) এবং সিনাই পর্বতে ঈশ্বরের কাছ থেকে দশ আজ্ঞা (Ten Commandments) ও তোরাহ গ্রহণের ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে।
৩. লেবীয় পুস্তক (Leviticus / ভাইকরা): এটি মূলত একটি আইনগত ও ধর্মীয় নির্দেশিকা। এতে পুরোহিতদের (কোহেনদের) দায়িত্ব, মন্দিরে পশু বলিদানের নিয়মাবলী, পবিত্রতা ও অপবিত্রতার আইন, খাদ্যাভ্যাসের নিয়ম (কোশের/Kosher আইন) এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
৪. গণনা পুস্তক (Numbers / বামিদবার): এই বইয়ে সিনাই পর্বত থেকে কেনান (প্রতিশ্রুতিপ্রাপ্ত দেশ) অভিমুখে বনী ইসরায়েলের ৪০ বছরের মরুভূমি যাত্রার বিবরণ রয়েছে। এতে ইসরায়েলীদের আদমশুমারি, তাদের বিদ্রোহ, ঈশ্বরের শাস্তি এবং মরুভূমিতে তাদের টিকে থাকার কাহিনি স্থান পেয়েছে।
৫. দ্বিতীয় বিবরণ (Deuteronomy / দেভারিম): এটি মোশির জীবনের শেষ দিনগুলোর বিবরণ। জর্ডান নদী পার হয়ে প্রতিশ্রুত দেশে প্রবেশের ঠিক আগে মোশি ইসরায়েলীদের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ভাষণ দেন, যেখানে তিনি পূর্ববর্তী আইনগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন, নতুন কিছু আইন যোগ করেন এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য সতর্ক করেন। এই বইয়ের শেষ দিকে মোশির মৃত্যুর বর্ণনা রয়েছে।
১.২ নেভিইম (Nevi’im)
‘নেভিইম’ অর্থ ‘নবীগণ’। এটি তানাখের দ্বিতীয় খণ্ড, যা ইসরায়েলীদের প্রতিশ্রুত দেশে প্রবেশ থেকে শুরু করে ব্যাবিলনীয় নির্বাসন পর্যন্ত ইতিহাস এবং নবীদের বাণী নিয়ে গঠিত। নেভিইমকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
-
পূর্ববর্তী নবীগণ (Former Prophets): এতে রয়েছে জোশুয়া (যিহোশূয়), বিচারকর্তৃগণ (Judges), স্যামুয়েল (শমূয়েল ১ ও ২) এবং রাজাবলি (Kings ১ ও ২)। এই বইগুলোতে কেনান বিজয়, বিচারকদের শাসন, ডেভিড (দাউদ) ও সলোমনের (শলোমন) রাজত্ব এবং ইসরায়েল ও যিহূদা রাজ্যের বিভাজন ও পতনের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
-
পরবর্তী নবীগণ (Latter Prophets): এতে রয়েছে যিশাইয় (Isaiah), যিরমিয় (Jeremiah) এবং যিহিষ্কেল (Ezekiel) এর মতো মহান নবীদের বই, এবং ‘বারোজন ছোট নবী’ (The Twelve Minor Prophets) এর সংকলন (যেমন- হোশেয়, যোয়েল, আমোস, যোনা, মীখা ইত্যাদি)। এই বইগুলোতে সামাজিক ন্যায়বিচার, ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য, পাপের জন্য অনুতাপ এবং ভবিষ্যতের মশীহ (Messiah) বা ত্রাণকর্তার আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে।
১.৩ কেতুভিম (Ketuvim)
‘কেতুভিম’ অর্থ ‘রচনাবলি’ বা ‘Writings’। এটি তানাখের তৃতীয় এবং শেষ খণ্ড। এতে কবিতা, প্রবাদ, দর্শন এবং ঐতিহাসিক বিবরণ স্থান পেয়েছে। কেতুভিম এর অন্তর্ভুক্ত বইগুলো হলো:
-
কাব্যিক গ্রন্থ: গীতসংহিতা (Psalms – যা রাজা ডেভিডের রচনা বলে মানা হয়), হিতোপদেশ (Proverbs), এবং ইয়োব (Job)।
-
পাঁচটি স্ক্রোল (Five Megillot): পরমগীত (Song of Songs), রূতের বিবরণ (Ruth), বিলাপ-গাথা (Lamentations), উপদেশক (Ecclesiastes), এবং ইষ্টেরের বিবরণ (Esther)। এই বইগুলো বিভিন্ন ইহুদি উৎসবে সিনাগগে পাঠ করা হয়।
-
ঐতিহাসিক গ্রন্থ: দানিয়েল (Daniel), ইষ্রা (Ezra), নহিমিয় (Nehemiah) এবং বংশাবলি (Chronicles ১ ও ২)।
২. মৌখিক তোরাহ এবং রাব্বিনীয় সাহিত্য
ইহুদি বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর সিনাই পর্বতে মোশিকে কেবল ‘লিখিত তোরাহ’ (তানাখ) দেননি, বরং এর সাথে এর ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের নিয়মকানুনও দিয়েছিলেন, যা ‘মৌখিক তোরাহ’ (Oral Torah) নামে পরিচিত। বহু শতাব্দী ধরে এই মৌখিক আইন মুখে মুখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থানান্তরিত হয়েছে। পরবর্তীতে, রোমান সাম্রাজ্যের যুগে ইহুদিদের নির্বাসন এবং ধর্মীয় স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাব্বিরা (পণ্ডিতরা) এই মৌখিক আইনগুলোকে লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। এই প্রক্রিয়ার ফলেই সৃষ্টি হয় সুবিশাল রাব্বিনীয় সাহিত্য।
২.১ মিশনাহ (Mishnah)
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে (প্রায় ২০০ খ্রিষ্টাব্দে) রাব্বি জুদাহ হা-নাসি (Judah the Prince) মৌখিক আইনগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল গ্রন্থে সংকলিত করেন, যার নাম মিশনাহ। এটি হিব্রু ভাষায় রচিত এবং রাব্বিনীয় ইহুদি ধর্মের প্রথম ও প্রধান আইনি গ্রন্থ। মিশনাহ ছয়টি মূল ভাগে বা ‘অর্ডারে’ (Sedarim) বিভক্ত:
১. জেরাইম (Zeraim – বীজ): কৃষি সংক্রান্ত আইন, জমির ফসল থেকে গরিবদের এবং পুরোহিতদের অংশ দেওয়ার নিয়ম এবং প্রার্থনার নিয়ম (যেমন শেমা প্রার্থনা)।
২. মোয়েদ (Moed – উৎসব): সাবাথ (বিশ্রামবার) এবং বিভিন্ন ইহুদি উৎসব (পাসওভার, ইয়োম কিপ্পুর, সুককোট ইত্যাদি) পালনের নিয়মাবলী।
৩. নাজিম (Nashim – নারী): বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, এবং পারিবারিক আইন।
৪. নেজিকিন (Nezikin – ক্ষতি): দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন, বিচার ব্যবস্থা, এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত নিয়মাবলী।
৫. কোদাশিম (Kodashim – পবিত্র বস্তু): জেরুজালেম মন্দিরে পশু বলিদান এবং পবিত্রতা রক্ষার নিয়মাবলী।
৬. তোহারোত (Tohorot – শুদ্ধতা): ধর্মীয় পবিত্রতা ও অপবিত্রতার জটিল আইন।
২.২ তালমুদ (Talmud)
মিশনাহ সংকলিত হওয়ার পর, পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যাবিলন এবং ইসরায়েলের রাব্বিরা মিশনাহর প্রতিটি অনুচ্ছেদ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক, আলোচনা এবং বিশ্লেষণ করেন। এই বিশ্লেষণের নাম গেমারা (Gemara)। মিশনাহ এবং গেমারা—এই দুটির সম্মিলিত রূপকেই তালমুদ বলা হয়। এটি ইহুদি ধর্মীয় আইন, দর্শন, নীতিশাস্ত্র, লোককথা এবং ইতিহাসের এক বিশাল বিশ্বকোষ।
তালমুদ দুটি সংস্করণে বিদ্যমান:
-
জেরুজালেম তালমুদ (Talmud Yerushalmi): এটি খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর দিকে ইসরায়েল ভূখণ্ডে সংকলিত হয়। এটি আকারে ছোট এবং এর আলোচনা কিছুটা সংক্ষিপ্ত।
-
ব্যাবিলনীয় তালমুদ (Talmud Bavli): এটি খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে ব্যাবিলনে (বর্তমান ইরাক) সংকলিত হয়। এটি অত্যন্ত বিশাল, জটিল এবং ইহুদি জগতে এটিই সবচেয়ে বেশি পঠিত ও প্রামাণ্য হিসেবে গৃহীত। যখন সাধারণভাবে “তালমুদ” শব্দটি উচ্চারণ করা হয়, তখন মূলত ব্যাবিলনীয় তালমুদকেই বোঝানো হয়।
তালমুদ শুধু আইনের শুষ্ক তালিকা নয়; এটি একটি প্রাণবন্ত গ্রন্থ যেখানে রাব্বিদের মধ্যকার তর্ক-বিতর্ক হুবহু লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি ইহুদিদের চিন্তাধারা এবং আইনি যুক্তির (Talmudic logic) মূল ভিত্তি।
২.৩ মিদরাশ (Midrash)
‘মিদরাশ’ হলো তানাখের পাঠ্যগুলির ব্যাখ্যামূলক সাহিত্য। যখন তোরাহ বা বাইবেলের কোনো শ্লোক অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ মনে হয়, তখন মিদরাশ বিভিন্ন গল্প, উপমা এবং রূপকের মাধ্যমে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে এবং শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ বের করে আনে। মিদরাশ দুই প্রকারের হতে পারে:
-
হালাখীয় মিদরাশ (Midrash Halakha): যা বাইবেলের শ্লোক থেকে সরাসরি আইন বা নিয়মকানুন উদ্ঘাটন করে।
-
আগাডীয় মিদরাশ (Midrash Aggadah): যা বাইবেলের শ্লোক অবলম্বনে নীতিগল্প, কিংবদন্তি এবং দার্শনিক শিক্ষা প্রদান করে।
২.৪ তোসেফতা (Tosefta)
এটি মিশনাহর সমসাময়িক আরেকটি সংকলন। যে সমস্ত মৌখিক আইন বা রাব্বিনীয় আলোচনা মিশনাহতে স্থান পায়নি, সেগুলোকে তোসেফতা গ্রন্থে সংকলন করা হয়েছে। এটি মিশনাহর একটি পরিপূরক গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩. হালাখা বা ইহুদি আইন সংহিতা
তালমুদ অত্যন্ত বিশাল এবং বিতর্ক-বহুল হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখান থেকে প্রাত্যহিক জীবনের আইন বা নির্দেশিকা খুঁজে বের করা কঠিন। তাই মধ্যযুগে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পণ্ডিত তালমুদ থেকে চূড়ান্ত আইনগুলো নির্যাস আকারে বের করে সুশৃঙ্খল আইন সংহিতা বা ‘হালাখা’ (Halakha) রচনা করেন।
৩.১ মিশনেহ তোরাহ (Mishneh Torah)
দ্বাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত ইহুদি দার্শনিক ও আইনজ্ঞ মাইমোনাইডস (Maimonides বা Rambam) এই বিশাল গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি পুরো তালমুদীয় সাহিত্য থেকে সমস্ত ইহুদি আইনকে ১৪টি খণ্ডে অত্যন্ত সহজ, স্পষ্ট এবং সুশৃঙ্খল হিব্রু ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন। এটি ইহুদি আইনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ।
৩.২ শুলখান আরুখ (Shulchan Aruch)
ষোড়শ শতাব্দীতে রাব্বি জোসেফ কারো (Joseph Karo) দ্বারা রচিত ‘শুলখান আরুখ’ (অর্থ: সাজানো টেবিল) হলো বর্তমান যুগে সবচেয়ে প্রামাণ্য এবং ব্যাপকভাবে গৃহীত ইহুদি আইন সংহিতা। এতে প্রাত্যহিক জীবনের সমস্ত নিয়ম—ঘুম থেকে ওঠা, খাওয়া, প্রার্থনা, ব্যবসা, বিবাহ, এবং উৎসব পালনের নিয়ম—অত্যন্ত বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। আধুনিক যুগের অর্থোডক্স ইহুদিরা তাদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় শুলখান আরুখ-এর নির্দেশনাই অনুসরণ করে থাকেন।
৩.৩ রেস্পন্সা (Responsa / She’elot u-Teshuvot)
রেস্পন্সা হলো ইহুদি আইনজ্ঞদের দেওয়া ফতোয়া বা প্রশ্নোত্তর সংকলন। যখন আধুনিক যুগে নতুন কোনো সমস্যার উদ্ভব হয় (যেমন- প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ইন্টারনেট ব্যবহার ইত্যাদি), যা সরাসরি তালমুদ বা শুলখান আরুখে উল্লেখ নেই, তখন সাধারণ মানুষ বা স্থানীয় রাব্বিরা বড় পণ্ডিতদের কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠান। পণ্ডিতরা তালমুদীয় আইনের ওপর ভিত্তি করে যে লিখিত উত্তর দেন, তাকে রেস্পন্সা বলা হয়। যুগ যুগ ধরে লক্ষ লক্ষ রেস্পন্সা রচিত হয়েছে, যা ইহুদি আইনকে যুগোপযোগী ও গতিশীল রেখেছে।
৪. কাব্বালাহ এবং রহস্যবাদী গ্রন্থ
ইহুদি ধর্মের একটি অত্যন্ত গভীর এবং রহস্যময় দিক রয়েছে, যাকে কাব্বালাহ (Kabbalah) বলা হয়। কাব্বালাহ মূলত ঈশ্বরের স্বরূপ, মহাবিশ্বের সৃষ্টি, আত্মার প্রকৃতি এবং জাগতিক দুনিয়ার সাথে আধ্যাত্মিক জগতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।
৪.১ জোহর (Zohar)
জোহর বা ‘The Book of Splendor’ হলো কাব্বালাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থ। এটি আরামীয় ভাষায় রচিত। যদিও ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হয় এটি দ্বিতীয় শতাব্দীর রাব্বি শিমন বার ইয়োচাই (Shimon bar Yochai) রচনা করেছেন, তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে স্পেনের রাব্বি মোজেস ডি লিওন (Moses de León) এটি প্রকাশ করেন। জোহর মূলত তোরাহর একটি রহস্যবাদী ব্যাখ্যা। এতে ‘সেফিরোত’ (Sephirot) বা ঈশ্বরের দশটি গুণের মাধ্যমে কীভাবে মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে, তার গভীর আলোচনা রয়েছে।
৪.২ সেফের ইয়েৎজিরাহ (Sefer Yetzirah)
এটি ইহুদি রহস্যবাদের প্রাচীনতম গ্রন্থগুলির অন্যতম, যার অর্থ ‘সৃষ্টির পুস্তক’। এই গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে যে, ঈশ্বর হিব্রু বর্ণমালার ২২টি অক্ষর এবং ১০টি সংখ্যার (সেফিরোত) মাধ্যমে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। এটি ইহুদি জাদুবিদ্যা এবং রহস্যবাদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
৫. লিটার্জি এবং প্রার্থনা গ্রন্থ
ইহুদি ধর্মীয় জীবন নিয়মিত প্রার্থনার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। তাদের দৈনন্দিন ও উৎসবের প্রার্থনার জন্য সুনির্দিষ্ট গ্রন্থ রয়েছে।
-
সিদ্দুর (Siddur): এটি ইহুদিদের দৈনন্দিন প্রার্থনা গ্রন্থ। এতে প্রতিদিনের তিন বেলার প্রার্থনা (শাহারিত-সকালে, মিনচা-বিকালে, মাআরিভ-রাতে), সাবাথের প্রার্থনা এবং বিভিন্ন আশীর্বাদের বাণী লিপিবদ্ধ থাকে।
-
মাখজোর (Machzor): এটি হলো বিশেষ উৎসবের প্রার্থনা গ্রন্থ। বিশেষ করে ‘রোশ হাশানাহ’ (ইহুদি নববর্ষ) এবং ‘ইয়োম কিপ্পুর’ (প্রায়শ্চিত্তের দিন) এর দীর্ঘ ও বিশেষ প্রার্থনার জন্য মাখজোর ব্যবহার করা হয়।
-
হাগাদাহ (Haggadah): পাসওভার (Passover) উৎসবের রাতে পড়ার জন্য নির্ধারিত গ্রন্থ। এতে মিশর থেকে ইসরায়েলীদের মুক্তির ঐতিহাসিক কাহিনি, প্রার্থনা এবং বিশেষ খাবার গ্রহণের নিয়মাবলী রয়েছে।
৬. পাঠ ও ব্যাখ্যার পদ্ধতি: পারদেস (PaRDeS)
ইহুদি পণ্ডিতরা ধর্মগ্রন্থ, বিশেষ করে তোরাহ অধ্যয়নের জন্য চারটি ভিন্ন স্তরের পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা একত্রে PaRDeS (হিব্রুতে পারদেস অর্থ ‘বাগান’ বা ‘স্বর্গ’) নামে পরিচিত:
১. পেশাত (Peshat): পাঠ্যের আক্ষরিক বা সরল অর্থ।
২. রেমেজ (Remez): রূপক বা লুকায়িত অর্থ, যা শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো ধারণাকে নির্দেশ করে।
৩. দেরাশ (Derash): নৈতিক বা ব্যাখ্যামূলক অর্থ (যেমনটা মিদরাশে পাওয়া যায়)।
৪. সোদ (Sod): গোপন বা রহস্যবাদী অর্থ (যা কাব্বালাহ বা জোহরে আলোচিত হয়)।
৭. ঐতিহাসিক সংরক্ষণ, পাণ্ডুলিপি এবং পাঠ্য শুদ্ধতা
ইহুদিরা তাদের ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে অবিশ্বাস্য সতর্কতার পরিচয় দিয়েছে।
মৃত সাগরের গোটানো পুঁথি (Dead Sea Scrolls)
১৯৪৭ সালে কুমরান গুহায় আবিষ্কৃত ‘মৃত সাগরের গোটানো পুঁথি’ হলো এযাবৎকালের প্রাপ্ত প্রাচীনতম বাইবেলের পাণ্ডুলিপি (খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের মধ্যে রচিত)। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর পাঠ্যের সাথে হাজার বছর পরের আধুনিক হিব্রু বাইবেলের পাঠ্যের প্রায় কোনো পার্থক্য নেই।
ম্যাসোরেটিক পাঠ (Masoretic Text)
প্রাচীন হিব্রু ভাষায় কোনো স্বরবর্ণ ছিল না। মধ্যযুগে (৭ম থেকে ১০ম শতকের মধ্যে) ‘ম্যাসোরেট’ (Masoretes) নামক ইহুদি পণ্ডিতদের একটি দল বাইবেলের পাঠকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য স্বরচিহ্ন (Vowel points) এবং উচ্চারণের সুরচিহ্ন (Cantillation marks) উদ্ভাবন করেন। তাদের প্রস্তুতকৃত পাঠ্যই বর্তমানে ‘ম্যাসোরেটিক টেক্সট’ নামে পরিচিত, যা বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের দ্বারা প্রামাণ্য বলে গৃহীত।
সোফের বা লিপিকার প্রথা
ইহুদি ধর্মে তোরাহ স্ক্রোল (Torah Scroll) হাতে লেখার জন্য অত্যন্ত কঠোর নিয়ম রয়েছে। একজন ‘সোফের’ (Sofer) বা লিপিকারকে পশুর চামড়ায় (পার্চমেন্ট) কালি এবং পালক দিয়ে নিখুঁতভাবে তোরাহ লিখতে হয়। একটি অক্ষর ভুল হলে বা মুছে গেলে পুরো পাতাটি বাতিল হয়ে যায়। পবিত্র ঈশ্বরের নাম (Tetragrammaton) লেখার সময় লিপিকারকে বিশেষ পবিত্রতা অর্জন করতে হয়।
৮. অন্যান্য আব্রাহামীয় ধর্মের ওপর প্রভাব
ইহুদি ধর্মগ্রন্থগুলো বিশ্বের অন্যান্য প্রধান ধর্মের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছে।
-
খ্রিষ্টধর্ম: খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের তানাখকে তাদের বাইবেলের ‘পুরাতন নিয়ম’ (Old Testament) হিসেবে গ্রহণ করেছে। খ্রিষ্টান ধর্মে যিশুকে (Jesus) ইহুদি ধর্মগ্রন্থে প্রতিশ্রুত মশীহ হিসেবে দাবি করা হয়, যদিও ইহুদি ধর্ম এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
-
ইসলাম ধর্ম: ইসলাম ধর্মে তোরাহকে ‘তাওরাত’ (যা হযরত মুসার ওপর অবতীর্ণ) এবং গীতসংহিতাকে ‘যবুর’ (যা হযরত দাউদের ওপর অবতীর্ণ) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কুরআনে ইহুদি ধর্মগ্রন্থের অনেক নবী এবং ঐতিহাসিক কাহিনির (যেমন—আদম, নূহ, ইব্রাহিম, ইউসুফ, মুসা) উল্লেখ রয়েছে, যা প্রমাণ করে এই গ্রন্থগুলোর আখ্যান কতটা বিস্তৃত।
৯. আধুনিক যুগে পঠন-পাঠন এবং তাৎপর্য
আধুনিক ইহুদি জীবনে ধর্মগ্রন্থের পাঠ কেবল জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং এটি একটি উপাসনা বা ইবাদত (Mitzvah) হিসেবে বিবেচিত হয়।
-
ইয়েশিভা (Yeshiva): ইহুদি ধর্মীয় বিদ্যালয়গুলোকে ইয়েশিভা বলা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা তালমুদ ও তোরাহ অধ্যয়নে ব্যয় করে।
-
দাফ ইয়োমি (Daf Yomi): এটি বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত একটি রুটিন, যেখানে প্রতিদিন তালমুদের একটি করে পৃষ্ঠা অধ্যয়ন করা হয়। ব্যাবিলনীয় তালমুদের ২,৭১১টি পৃষ্ঠা শেষ করতে প্রায় সাড়ে সাত বছর সময় লাগে।
-
সিনাগগে পাঠ: প্রতি শনিবার (সাবাথ) ইহুদিদের উপাসনালয় বা সিনাগগে তোরাহ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ পাঠ করা হয়। পুরো তোরাহটি এক বছরে ধারাবাহিকভাবে পড়ে শেষ করার এই প্রথা হাজার বছর ধরে চলে আসছে।
উপসংহার
ইহুদি ধর্মগ্রন্থগুলো কেবল একটি জাতির ইতিহাস বা ধর্মীয় আইনের সংকলন নয়, এগুলো ইহুদি জাতির টিকে থাকার মূল ভিত্তি। হাজার হাজার বছরের নির্বাসন, অত্যাচার এবং দেশহীন অবস্থার মধ্যেও ইহুদিরা তাদের ধর্মগ্রন্থগুলোর মাধ্যমে নিজেদের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেছে। তোরাহ থেকে শুরু করে তালমুদ ও কাব্বালাহ পর্যন্ত এই সুবিশাল সাহিত্যভাণ্ডার আজও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। মানব ইতিহাসের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বিকাশে ইহুদি ধর্মগ্রন্থের এই নিরবচ্ছিন্ন ধারা একটি অনন্য এবং বিস্ময়কর অবদান।
তথ্যসূত্রঃ
১. প্রামাণ্য এনসাইক্লোপিডিয়া ও ওয়েবসাইট
-
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (Encyclopedia Britannica): ইহুদি ধর্ম (Judaism), তোরাহ (Torah), তালমুদ (Talmud) এবং কাব্বালাহ (Kabbalah) নিয়ে ব্রিটানিকায় অত্যন্ত তথ্যবহুল এবং নিরপেক্ষ একাডেমিক আর্টিকেল রয়েছে।
-
মাই জুয়িশ লার্নিং (My Jewish Learning): (www.myjewishlearning.com) এটি ইহুদি ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে সাধারণ পাঠকদের জন্য একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট।
-
জিউইশ এনসাইক্লোপিডিয়া (Jewish Encyclopedia): (www.jewishencyclopedia.com) ১৯০১ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত এই বিশাল এনসাইক্লোপিডিয়াটি ইহুদি ইতিহাস এবং সাহিত্যের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
২. মূল ধর্মগ্রন্থের ডিজিটাল লাইব্রেরি
-
সেফারিয়া (Sefaria): (www.sefaria.org) এটি ইহুদি ধর্মগ্রন্থের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত ডিজিটাল লাইব্রেরি। এখানে তানাখ, মিশনাহ, তালমুদ, মিদরাশ থেকে শুরু করে আধুনিক রেস্পন্সা পর্যন্ত প্রায় সবকিছু হিব্রু এবং ইংরেজি অনুবাদসহ বিনামূল্যে পড়া যায়।
-
খাবাদ (Chabad.org): অর্থোডক্স ইহুদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তোরাহ এবং ইহুদি আইন (হালাখা) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এটি একটি চমৎকার তথ্যভাণ্ডার।