ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু গল্প থাকে যা রূপকথাকেও হার মানায়। তেমনি এক আধুনিক রূপকথার রচয়িতা হলেন লিওনেল স্কালোনি (Lionel Scaloni)। ২০১৮ সালে যখন তিনি আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের (Argentina National Football Team) কোচের দায়িত্ব নেন, তখন দেশের ফুটবলপ্রেমী থেকে শুরু করে বড় বড় সমালোচকরাও ভুরু কুঁচকেছিলেন। কোনো বড় ক্লাব বা আন্তর্জাতিক দলের প্রধান কোচ হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা এই তরুণকে ভাবা হয়েছিল সাময়িক এক জোড়াতালি।
কিন্তু গত কয়েক বছরে লিওনেল মেসসি (Lionel Messi) এবং আলবিসেলেস্তেদের সঙ্গে মিলে স্কালোনি যা অর্জন করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা পুনরুত্থানের গল্প। কোপা আমেরিকা ২০২১, ফিনালিসিমা ২০২২, এবং কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ জয়ের পর বর্তমানে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চেও তিনি আর্জেন্টিনার প্রধান সেনাপতি। ফুটবল বিশ্বের এই মাস্টারমাইন্ডকে নিয়ে আজ আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।
লিওনেল স্কালোনি কে? (Who is Lionel Scaloni?)
লিওনেল সেবাস্তিয়ান স্কালোনি ১৯৭৮ সালের ১৬ মে আর্জেন্টিনার পুজাতো নামক এক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ছিলেন একজন ডিফেন্ডার এবং রাইট-ব্যাক। ক্লাব ক্যারিয়ারে তিনি রিয়াল জারাগোজা, দেপোর্তিভো লা করুনা, লাৎসিও এবং আতালান্তার মতো ক্লাবে খেলেছেন। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে তিনি কতটা প্রতিভাবান ছিলেন, তার চেয়ে বড় কথা তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত টিম ম্যান। ২০১৫ সালে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার পর তিনি কোচিং পেশায় মনোনিবেশ করেন।
কোচিং ক্যারিয়ারের শুরু এবং ‘লা স্কালোনেতা’র উত্থান
২০১৬ সালে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে সেভিয়া ক্লাবে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন স্কালোনি। পরবর্তীতে সাম্পাওলি যখন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন, স্কালোনিও তার সহকারী হিসেবে আলবিসেলেস্তে শিবিরে যোগ দেন। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ভরাডুবির পর সাম্পাওলিকে বরখাস্ত করা হলে, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে স্কালোনিকে দায়িত্ব দেয়।
অভিজ্ঞতাহীন একজন তরুণকে কোচ করায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিও তখন সমালোচনা করে বলেছিলেন, “স্কালোনি ভালো ছেলে, কিন্তু ও তো ট্রাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না! ওকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া কীভাবে সম্ভব?”
তবে সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে স্কালোনি তৈরি করলেন নিজের এক সাম্রাজ্য, যা ফুটবল বিশ্বে ‘লা স্কালোনেতা’ (La Scaloneta) নামে পরিচিতি পায়। তার অধীনে আর্জেন্টিনা দল একের পর এক ম্যাচ জিততে শুরু করে এবং অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার সাফল্য ও ট্রফি তালিকা
লিওনেল স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা প্রায় তিন দশকের ট্রফিখরা দূর করে। তার প্রধান সাফল্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
-
কোপা আমেরিকা ২০২১ (Copa America 2021): মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ২৮ বছর পর কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতে। এটি ছিল লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক বড় ট্রফি।
-
ফিনালিসিমা ২০২২ (Finalissima 2022): ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এই ট্রফি ঘরে তোলে স্কালোনির শিষ্যরা।
-
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ (FIFA World Cup 2022): কাতারের মাটিতে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার ঘরে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দেন স্কালোনি।
-
টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড: ইতালি ও ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে টানা ৩৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত থাকার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে স্কালোনির আর্জেন্টিনা।
কৌশল ও ট্যাকটিকস: কীভাবে দল পরিচালনা করেন স্কালোনি?
লিওনেল স্কালোনির সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো তার কৌশলগত নমনীয়তা (Tactical Flexibility)। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ফরমেশনে আটকে থাকেন না। প্রতিপক্ষের শক্তি এবং দুর্বলতা বিবেচনা করে তিনি ম্যাচের কৌশল পরিবর্তন করেন।
-
ফরমেশন: সাধারণত তিনি ৪-৪-২ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে দল সাজালেও, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী তা ৪-২-৩-১ বা ৫-৩-২ এ রূপ নিতে পারে।
-
তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশ্রণ: স্কালোনির অন্যতম বড় কৃতিত্ব হলো তিনি শুধু বড় নামের ওপর নির্ভর করেননি। এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ, এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো তরুণদের তিনি সঠিক সময়ে দলে সুযোগ দিয়ে তারকা বানিয়েছেন।
-
মেসি-নির্ভরতা কমানো: স্কালোনির আগে আর্জেন্টিনা দল পুরোপুরি ‘মেসি-নির্ভর’ ছিল। স্কালোনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন যেখানে সবাই মেসির জন্য লড়ে, আবার মেসিকে ছাড়াও দল যেন ছন্দ না হারায়।
লিওনেল মেসি ও লিওনেল স্কালোনি রসায়ন
আর্জেন্টিনার ফুটবলে এই দুই ‘লিও’-র রসায়ন অনন্য। স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। তিনি মেসির ওপর থেকে বাড়তি চাপ কমিয়ে তাকে মাঠে স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ করে দেন। মেসি নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে স্কালোনির ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধি এবং খেলোয়াড়দের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে মেসি খেলবেন কি না তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও, স্কালোনির দূরদর্শী পরিকল্পনায় মেসি এখনও দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্কালোনি
বর্তমানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে (FIFA World Cup 2026) সামনে রেখে স্কালোনি তার দল গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা তাদের প্রাথমিক স্কোয়াড ঘোষণা করেছে। তবে এবারের মিশনটি স্কালোনির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। আনহেল দি মারিয়ার মতো অভিজ্ঞ তারকারা অবসরে গেছেন, যার ফলে দলে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে।
পাশাপাশি, সম্প্রতি রিয়াল মাদ্রিদের (Real Madrid) মতো ইউরোপীয় জায়ান্ট ক্লাবগুলোর কোচ হওয়ার দৌড়ে স্কালোনির নাম জোরেসোড়ে শোনা যাচ্ছে। তবে সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে স্কালোনির বর্তমান মূল লক্ষ্য আর্জেন্টিনার হয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি ধরে রাখা। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, স্কালোনি এবার সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে চান।
লিওনেল স্কালোনি সম্পর্কিত কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs)
১. লিওনেল স্কালোনি কোন দেশের কোচ?
লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনা পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ।
২. স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা কতটি ট্রফি জিতেছে?
তার অধীনে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত ৪টি প্রধান ট্রফি জিতেছে (কোপা আমেরিকা ২০২১ ও ২০২৪, ফিনালিসিমা ২০২২ এবং ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২)।
৩. ‘লা স্কালোনেতা’ শব্দের অর্থ কী?
এটি স্কালোনির নাম থেকে আসা একটি ফুটবলীয় শব্দবন্ধ, যার অর্থ ‘স্কালোনির দল বা স্কালোনির গাড়ি’। আর্জেন্টিনার ভক্তরা তাদের দলের দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক ও গোছানো ফুটবল শৈলীকে বোঝাতে এই নাম ব্যবহার করেন।
৪. লিওনেল স্কালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ কতদিন?
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) সাথে স্কালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
উপসংহার
ফুটবল কোচিংয়ে অভিজ্ঞতা যে সবসময় শেষ কথা নয়, তা প্রমাণ করেছেন লিওনেল স্কালোনি। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি বিশ্বজয়ী কোচ। তার শান্ত স্বভাব, ইগোবিহীন ড্রেসিংরুম পরিচালনা এবং নিখুঁত কৌশল তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ম্যানেজারে পরিণত করেছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আলবিসেলেস্তেরা ট্রফি ধরে রাখতে পারুক বা না পারুক, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল স্কালোনির নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
