সোনালী ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC) হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সর্ববৃহৎ এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ব্যাংক। স্বাধীনতার পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং আপামর জনসাধারণের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র পর্যন্ত এর বিস্তৃতি রয়েছে।
| সোনালী ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC) | |
| আইনি নাম | সোনালী ব্যাংক পিএলসি |
| প্রতিষ্ঠা | ২৬ মার্চ, ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নম্বর ২৬, ১৯৭২) |
| সদর দপ্তর | সোনালী ব্যাংক ভবন, ৩৫-৪২, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ |
| ধরণ | রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি |
| মালিকানা | গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (১০০% শেয়ার) |
| শাখা সংখ্যা | ১,২৩০টি (দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে) |
| প্রধান ব্যক্তিত্ব |
মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (চেয়ারম্যান) মো. শওকত আলী খান (ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও) |
| আর্থিক অবস্থা (২০২৫) |
আমানত: ~১.৮০ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ ও অগ্রিম: ~১.০৫ ট্রিলিয়ন টাকা |
| সহযোগী প্রতিষ্ঠান | সোনালী ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, সোনালী এক্সচেঞ্জ (ইউএসএ), সোনালী ব্যাংক ইউকে |
| অফিসিয়াল ওয়েবসাইট | sonalibank.com.bd |
ইতিহাস ও পটভূমি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার একটি বড় পদক্ষেপ নেয়। ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ “বাংলাদেশ ব্যাংকস (ন্যাশনালাইজেশন) অর্ডার ১৯৭২” বা রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নম্বর ২৬-এর অধীনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত তিনটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়। ব্যাংক তিনটি হলো:
-
ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (National Bank of Pakistan)
-
банк অব বাহাওয়ালপুর (Bank of Bahawalpur)
-
প্রিমিয়ার ব্যাংক (Premier Bank)
এই তিনটি ব্যাংকের সকল শাখা, কর্মী, দায় এবং সম্পত্তি একীভূতকরণের মাধ্যমে জন্ম নেয় “সোনালী ব্যাংক”। প্রতিষ্ঠার সময় ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) টাকা।
কর্পোরেট রূপান্তর
পরবর্তীতে ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও আধুনিক, ব্যবসায়িক ও গতিশীল করতে ২০০৭ সালের ৩রা জুন যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে এটি “সোনালী ব্যাংক লিমিটেড” নামে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় এবং রাষ্ট্র এর শতভাগ শেয়ারের মালিক থাকে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক ব্যাংকিং রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং সংশোধিত কোম্পানি আইন অনুযায়ী এর নাম পরিবর্তন করে চূড়ান্তভাবে “সোনালী ব্যাংক পিএলসি” করা হয়।
ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি
সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধ ব্যাংক। বর্তমানে এর মোট শাখার সংখ্যা ১,২৩০টি। এর একটি বড় অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর সিংহভাগ শাখা (প্রায় ৭৪০টিরও বেশি) গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এবং ‘ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন’ বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও রেমিট্যান্স হাব
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের প্রবাহ সচল রাখতে সোনালী ব্যাংক আন্তর্জাতিকভাবে তার নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে:
-
ভারত: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ব্যাংকের দুটি পূর্ণাঙ্গ শাখা রয়েছে—একটি কলকাতার লাউডন স্ট্রিটে এবং অন্যটি শিলিগুড়িতে। এই শাখাগুলো মূলত ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং সেবা দেয়।
-
যুক্তরাজ্য (UK): প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স ও ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যের জন্য ২০০১ সালে লন্ডনে যৌথ মালিকানায় ‘সোনালী বাংলাদেশ ইউকে লিমিটেড’ (SBUK) পরিচালিত হয়ে আসছে (যেখানে সোনালী ব্যাংকের শেয়ার ৫১% এবং বাংলাদেশ সরকারের ৪৯%)। লন্ডনের বাইরে ওল্ডহাম ও বার্মিংহামেও এর বুথ রয়েছে।
-
যুক্তরাষ্ট্র (USA): যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে দেশে পাঠানোর জন্য ‘সোনালী এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ইনকর্পোরেটেড’ (SECI) কাজ করছে, যার প্রধান কার্যালয় নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে অবস্থিত।
-
মধ্যপ্রাচ্য: মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, জেদ্দা ও রিয়াদে ব্যাংকটির নিজস্ব প্রতিনিধি অফিস (Representative Office) রয়েছে যা রেমিট্যান্স সংগ্রহে ভূমিকা রাখে।
সেবাসমূহ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
সোনালী ব্যাংক মূলত একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক হলেও এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ট হিসেবে সরকারের “কোষাগার” বা ট্রেজারি ফাংশন পরিচালনা করে। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানে সোনালী ব্যাংক সরকারের পক্ষে টাকা জমা ও উত্তোলনের কাজ করে।
১. সাধারণ ও কর্পোরেট ব্যাংকিং
-
চলতি, সঞ্চয়ী, মেয়াদি আমানত এবং বিভিন্ন বিশেষ সঞ্চয়ী স্কিম।
-
দেশের বড় বড় মেগা প্রজেক্ট (যেমন: পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র) এবং রাষ্ট্রীয় আমদানির (সার, জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য) জন্য এলসি (LC) খোলা ও অর্থায়ন।
২. ঋণ ও বিশেষ অর্থায়ন
-
কৃষি ও পল্লী ঋণ: দেশের কৃষকদের দোরগোড়ায় স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ ও শস্য ঋণ পৌঁছানো।
-
এসএমই (SME) ঋণ: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা।
-
ভোক্তা অর্থায়ন: সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বিশেষ লোন স্কিম (Personal Loan)।
৩. ইসলামী ব্যাংকিং
২০১০ সালের ২রা জুন থেকে সোনালী ব্যাংক সম্পূর্ণ পৃথক উইন্ডোর মাধ্যমে শরীয়াহ্ ভিত্তিক ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ সেবা চালু করে। বর্তমানে ব্যাংকের বহু শাখায় ডেডিকেটেড ইসলামী ব্যাংকিং কর্নার রয়েছে।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা (সবচেয়ে বড় উইন্ডো)
সোনালী ব্যাংক কোনো ধরনের ফি ছাড়াই সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিপুল পরিমাণ কাজ ফ্রিতে বা নামমাত্র মূল্যে করে থাকে:
-
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা বিতরণ।
-
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বিতরণ।
-
সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বিতরণ।
-
হজ যাত্রীদের টাকা জমা নেওয়া এবং প্রসেসিং।
-
সরকারি বিভিন্ন সেবার ট্যাক্স, ভ্যাট, এবং ইউটিলিটি বিল (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) সংগ্রহ।
ডিজিটাল রূপান্তর ও “সোনালী ই-সেবা”
সনাতন আমলের “খাতা-কলমের” ব্যাংকিং থেকে বের হয়ে সোনালী ব্যাংক এখন সম্পূর্ণ সিবিএস (Core Banking Solution) বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের আওতায় এসেছে।
-
সোনালী ই-সেবা (Sonali e-Sheba): এটি ব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ মোবাইল অ্যাপ। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা ঘরে বসেই মাত্র ২ মিনিটে ই-কেওয়াইসি (e-KYC) ব্যবহার করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন।
-
সোনালী ই-वॉलेट (Sonali e-Wallet): এই অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যালেন্স চেক, ফান্ড ট্রান্সফার (BEFTN, RTGS, NPSB), মোবাইল রিচার্জ এবং ইউটিলিটি বিল পে করা যায়।
-
ব্লেজ (BLAZE) সেবা: প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা করার জন্য ব্লেজ সেবা চালু করা হয়েছে, যা ২৪/৭ সচল থাকে।
-
পেমেন্ট গেটওয়ে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি এখন সোনালী ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অনলাইনে দেওয়া যায়।
আর্থিক চিত্র, চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য
বিশাল নেটওয়ার্ক এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানার কারণে সোনালী ব্যাংককে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অতীতে কিছু বড় ঋণ কেলেঙ্কারি এবং বড় বড় রাষ্ট্রীয় কলকারখানায় অবলিগেশন লোনের কারণে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ (NPL) ও প্রভিশন ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছিল।
তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (বিশেষ করে ২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত) ব্যাংকটি রিকভারি ড্রাইভ বা ঋণ আদায়ে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক আর্থিক সূচক:
বর্তমানে ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৮০ ট্রিলিয়ন (১,৮০,০০০ কোটি) টাকা এবং মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১.০৫ ট্রিলিয়ন টাকা। নগদ আদায় ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকটি তার খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে এবং পরিচালন মুনাফায় (Operating Profit) ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের জন্য সোনালী ব্যাংক দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। বিশেষ করে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” বিনির্মাণে ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি (FinTech) ব্যবহারের জন্য সাউথ এশিয়ান বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডসহ বেশ কিছু সম্মাননা লাভ করেছে।