চন্দ্রবিল—নামটা শুনলেই কেমন যেন একটা ঠাণ্ডা শিরশিরে ভাব চলে আসে। গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এক পুরনো, ধ্বংসপ্রায় বাড়ি, যার পেছনে রয়েছে বিস্তীর্ণ একটি জলাশয়। কুয়াশা ঢাকা সেই বিলটি আজও জোছনার রাতে অদ্ভুত শব্দে গমগম করে। কেউ বলে, সেখানে চাঁদের আলোয় নাকি এক সাদা শাড়ি পরা মহিলা হাঁটে—চোখ দুটো তার কালো গহ্বরের মতো ফাঁকা, পা দুটো উল্টো দিকে ঘোরা।
এই গল্পটা শুরু হয়েছিল চারজন বন্ধুর দুঃসাহসিকতায়—রাহুল, তন্ময়, সোহেল আর মেহেদী। কলেজে পড়াকালীন তারা ঠিক করল, রাত ১২টায় চন্দ্রবিলে যাবে। সাহস দেখাতে হবে। গ্রামের লোকের গালগল্পে তারা বিশ্বাস করে না। ভূতের ভয়! ওসব তো মনের ভুল!
তারা রাত সাড়ে এগারোটার দিকে রওনা দিল চারজন একটা মোটরসাইকেলে। সঙ্গে ফ্ল্যাশলাইট, কিছু স্ন্যাকস, আর সাহসের গোঁসাই। পথটা অন্ধকার, শুধু হেডলাইটের আলোয় দেখা যায় সামনের রাস্তাটা। চারদিক নিস্তব্ধ। কুকুরের ডাকে হঠাৎ হৃৎপিণ্ডটা ধক করে ওঠে।
চন্দ্রবিলে পৌঁছে তারা মোটরসাইকেলটা একটি গাছের পাশে দাঁড় করিয়ে দেয়। উপরে পূর্ণিমার চাঁদ, নিচে বিলের নিঃস্তব্ধ জল। কেমন যেন এক অচেনা হিমেল বাতাস বইছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু মাঝে মাঝে কচুরিপানার ফিসফিসানি।
“কিছুই তো নেই! ভূত-টুত কিছু না। সব ফালতু!”—তন্ময় বলে উঠল।
রাহুল মৃদু হাসে, “চলো, একটু ভেতরে গিয়ে দেখি।”
বিলের পাড় ঘেঁষে তারা হেঁটে যেতে থাকে। হঠাৎ মেহেদী থেমে যায়, “তোমরা শুনছো? কারো কান্নার শব্দ আসছে না?”
সবার কানে এবার ভেসে আসে একটা মিহি অথচ করুণ কান্না—যেন কোনো নারী দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, অন্ধকারের গর্ভে। ফ্ল্যাশলাইট ঘুরিয়ে তারা দেখতে থাকে, কিন্তু কিছুই নেই। কেবল কুয়াশা আর ভেজা ঘাসের গন্ধ।
সোহেল একটু জোরে বলল, “কে আছেন ওখানে?”
প্রথমে কিছুই না। তারপর এক বিকট ঠাস করে শব্দ হলো! যেন কেউ জল থেকে উঠে দাঁড়াল!
তারা হঠাৎ দেখে, বিলের মাঝখানে একজন দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শাড়ি, ঝুলে পড়া ভেজা চুল, মুখটা স্পষ্ট দেখা যায় না। ফ্ল্যাশলাইট তার মুখে পড়তেই সবাই জায়গাতেই জমে গেল।
ওর মুখ ছিলই না। ফাঁকা। কেবল গর্তের মতো দুই চোখ আর একটা কালো ছায়া মুখের জায়গায়।
তন্ময় চিৎকার করে উঠল, “দৌড়াও!”
চারজন প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করল। হঠাৎ মেহেদী পিছলে পড়ে গেল কাদায়। তারা ফিরে তাকায় না। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তিনজন পালিয়ে যায়। কিন্তু মেহেদী আর ফেরেনি।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকজন চন্দ্রবিলে গিয়ে যা দেখে, তাতে চমকে ওঠে। মেহেদীর দেহ জল থেকে আধভেজা অবস্থায় পাওয়া যায়। মুখটা ছিল বিকৃত, চোখ দুটি ফাঁকা আর ঠোঁটে জমে থাকা রক্ত!
গ্রামে আবারও ছড়িয়ে পড়ে গুজব—চন্দ্রবিল আবার রক্ত চেয়েছে।
—
তিন মাস কেটে যায়। তন্ময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। সোহেল মুখে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। আর রাহুল এক রাতে নিজের ঘরে ফাঁসি দেয়।
কিন্তু মেহেদীর পরিবার এখনো প্রশ্ন করে—“কী দেখেছিল ওরা সেই রাতে?”
গ্রামে আজও পূর্ণিমার রাতে কেউ চন্দ্রবিলের দিকে মুখ করে না।
আর হাওয়ায় ভেসে আসে এক করুণ নারীকণ্ঠ—
“আমার মুখ কেড়ে নিয়েছো, এবার আমি তোমারটা চাই…”
