ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও নিখুঁত জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা কোরআন মাজিদে ঘোষণা করেছেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়িদা: ৩)। দ্বীন যেহেতু পরিপূর্ণ, তাই এতে নতুন করে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামি পরিভাষায় দ্বীনের মধ্যে এই নতুন কিছু সংযোজন করাকেই বলা হয় ‘বিদআত’। বিদআতের ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
বিদআত কী?
‘বিদআত’ (بدعة) একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো— নতুন কিছু সৃষ্টি করা বা পূর্বের কোনো নমুনা ছাড়া নতুন কিছু উদ্ভাবন করা।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়— সওয়াবের আশায় দ্বীনের বা ইবাদতের মধ্যে এমন কোনো নতুন পদ্ধতি বা কাজের উদ্ভব করা, যার কোনো প্রমাণ বা ভিত্তি কোরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামদের যুগে ছিল না, তাকেই বিদআত বলা হয়।
বিদআত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও সহিহ হাদিসসমূহ
বিদআতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। নিচে এ সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস উল্লেখ করা হলো:
১. প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা: জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন খুতবা দিতেন, তখন তাঁর চোখ লাল হয়ে যেত, আওয়াজ উঁচু হতো এবং রাগ বেড়ে যেত। তিনি খুতবায় বলতেন:
“নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং সর্বোত্তম আদর্শ হলো মুহাম্মাদ (সা.)-এর আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো (দ্বীনের মাঝে) নতুন উদ্ভাবিত বিষয়। আর প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই (বিদআত) হলো ভ্রষ্টতা।” — (সহিহ মুসলিম: ১৮৮৫, সুনানে নাসাঈ: ১৫৭৮)
২. বিদআতি আমল প্রত্যাখ্যাত: যে ইবাদত রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের নির্দেশিত পথে হবে না, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের এই ধর্মে এমন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত (অর্থাৎ তা কবুল হবে না)।” — (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
সহিহ মুসলিমের অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে:
“যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।”
৩. বিদআতের পরিণতি জাহান্নাম: বিদআত মানুষকে সুন্নাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং পরিণামে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে। ইরবাদ ইবনু সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“…তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ (বিদআত) থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রতিটি নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।” — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিজি: ২৬৭৬) সুনানে নাসাঈর (১৫৭৮) বর্ণনায় এর সাথে আরও যুক্ত হয়েছে: “আর প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতি হলো জাহান্নাম।”
বিদআতের ক্ষতিকর দিক ও ভয়াবহতা
হাদিসের আলোকে বিদআতের বেশ কিছু ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক রয়েছে:
-
সুন্নাহর বিলুপ্তি: বিখ্যাত তাবেঈ হাসান বাসরি (রহ.) বলেন, “যখনই কোনো জাতি দ্বীনের মধ্যে কোনো বিদআত তৈরি করে, তখনই আল্লাহ তাদের থেকে সমপরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন।”
-
হাউজে কাউসার থেকে বঞ্চনা: কিয়ামতের দিন বিদআতিরা হাউজে কাউসারের পানি পান করতে পারবে না। সহিহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী, ফেরেশতারা কিছু মানুষকে হাউজে কাউসার থেকে তাড়িয়ে দেবেন। তখন নবীজি (সা.) বলবেন, এরা তো আমার উম্মত। তখন বলা হবে, “আপনি জানেন না, আপনার মৃত্যুর পর এরা দ্বীনের মধ্যে কী কী নতুন বিষয় (বিদআত) উদ্ভাবন করেছিল।”
-
তওবার তৌফিক ছিনিয়ে নেওয়া হয়: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বিদআতির তওবার পথ বন্ধ করে দেন, যতক্ষণ না সে তার বিদআত পরিত্যাগ করে।” (সিলসিলাতুস সহিহাহ: ১৬২০)।
উপসংহার
ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য দুটি প্রধান শর্ত রয়েছে— এক. কাজটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির (ইখলাস) জন্য করা এবং দুই. কাজটি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো সুন্নাহ বা পদ্ধতি অনুযায়ী হওয়া। এর যেকোনো একটির অভাব হলে সেই ইবাদত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তাই আমাদের উচিত সব ধরনের আবেগ ও কুসংস্কার দূরে সরিয়ে রেখে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করা এবং সব ধরনের বিদআত থেকে নিজেকে ও সমাজকে মুক্ত রাখা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহর ওপর অটল থাকার এবং বিদআত থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।