শেরশাহ সুরি (১৪৮৬ – ২২ মে ১৫৪৫) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর আসল নাম ছিল ফরিদ খান। মাত্র পাঁচ বছরের (১৫৪০-১৫৪৫) স্বল্পস্থায়ী শাসনামলে তিনি সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে যে যুগান্তকারী সংস্কার সাধন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও মডেল হিসেবে অনুসৃত হয়েছিল। তিনি আধুনিক ‘রুপি’ বা মুদ্রাব্যবস্থার প্রবর্তক এবং বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড’-এর পুনর্নির্মাণকারী হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
-
আসল নাম: ফরিদ খান
-
উপাধি: শের খান, শেরশাহ
-
জন্ম: ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দ (ধারণা করা হয়), সাসারাম, বিহার (মতান্তরে হিসার ফিরোজা)
-
মৃত্যু: ২২ মে ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ, কালিঞ্জর দুর্গ
-
সমাধিস্থল: সাসারাম, বিহার, ভারত
-
রাজবংশ: সুরি রাজবংশ
-
পূর্বসূরি: হুমায়ুন (মুঘল সম্রাট)
-
উত্তরসূরি: ইসলাম শাহ সুরি
প্রাথমিক জীবন ও নামের উৎপত্তি
শেরশাহের জন্মস্থান এবং জন্মসাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি ১৪৮৬ সালে বিহারের সাসারামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হাসান খান সুরি ছিলেন সাসারামের একজন জায়গিরদার। ফরিদ খানের বাল্যকাল খুব একটা সুখের ছিল না। সৎমায়ের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তিনি খুব অল্প বয়সেই গৃহত্যাগ করে জৌনপুরে চলে যান। জৌনপুর তখন ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। সেখানে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
‘শের খান’ উপাধি লাভ: শিক্ষাজীবন শেষে তিনি বিহারের স্বাধীন আফগান শাসক বাহার খান লোহানির অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। একদিন বাহার খানের সাথে শিকারে গিয়ে তরুণ ফরিদ খান খালি হাতে এবং কেবল একটি তরবারির সাহায্যে একটি বিশাল বাঘ (মতান্তরে সিংহ) হত্যা করেন। তাঁর এই অসীম সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে বাহার খান তাকে ‘শের খান’ (বাঘের মতো সাহসী) উপাধি প্রদান করেন।
ক্ষমতায় আরোহণ
শের খানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল অত্যন্ত ধারাবাহিক এবং কৌশলগত। ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলে, শের খান কিছুকালের জন্য বাবরের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে থেকে তিনি মুঘলদের সামরিক কৌশল, দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক কাঠামো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি বিহারে ফিরে যান এবং নিজের শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুন যখন দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখন শের খান নিজেকে একজন শক্তিশালী আফগান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
চৌসা ও কনৌজের যুদ্ধ: হুমায়ুনের সাথে শের খানের মূল সংঘাত শুরু হয়।
-
চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯): বক্সারের নিকটবর্তী চৌসা নামক স্থানে শের খান সম্রাট হুমায়ুনকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এই বিজয়ের পরই তিনি ‘শেরশাহ’ উপাধি ধারণ করেন এবং নিজের নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা প্রচলন করেন।
-
কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ (১৫৪০): ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে শেরশাহ মুঘল বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। হুমায়ুন প্রাণ নিয়ে পারস্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং শেরশাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করে সুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারঃ শেরশাহ রাজত্বকাল
শেরশাহের মাত্র পাঁচ বছরের শাসনকাল ইতিহাসে তাঁর সামরিক বিজয়ের চেয়ে বরং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্যই বেশি স্মরণীয়।
১. ভূমি ও রাজস্ব সংস্কার
তিনি একটি নিখুঁত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন। কৃষকদের সুবিধার জন্য তিনি জমির জরিপ করান এবং জমির উর্বরতা অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করেন। তিনি কৃষকদের ‘পাট্টা’ (জমির মালিকানার দলিল) প্রদান করেন এবং কৃষকরা সরকারকে যে রাজস্ব দিতে বাধ্য থাকবে, তা স্বীকার করে ‘কবুলিয়ত’ নামক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার নিয়ম চালু করেন। এর ফলে কৃষকদের ওপর জমিদারদের শোষণ অনেকাংশে কমে যায়।
২. মুদ্রাব্যবস্থার সংস্কার
শেরশাহের সবচেয়ে বড় অবদান হলো আধুনিক মুদ্রাব্যবস্থার প্রবর্তন। তিনি আগের সব মিশ্র ধাতুর মুদ্রা বাতিল করে নির্দিষ্ট ওজনের রূপার মুদ্রা চালু করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘রুপিয়া’ (Rupiya)। এই রুপিয়াই হলো আধুনিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও বাংলাদেশের ‘রুপি’ বা ‘টাকা’-এর পূর্বসূরি। এছাড়াও তিনি ছোট লেনদেনের জন্য ‘দাম’ নামক তামার মুদ্রা চালু করেন।
৩. যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ডাক বিভাগ
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে শেরশাহ যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তিনি প্রাচীনকালের পথগুলোকে সংস্কার করে চারটি বড় সড়ক নির্মাণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো সড়ক-ই-আজম (পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এর নাম দেয় গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড বা জিটি রোড)। এটি বাংলার সোনারগাঁও থেকে শুরু করে আগ্রা ও দিল্লি হয়ে পাকিস্তানের পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তিনি এই সড়কের পাশে প্রতি দুই ক্রোশ অন্তর অন্তর সরাইখানা (বিশ্রামাগার) নির্মাণ করেন। এই সরাইখানাগুলো ডাকঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তিনি ঘোড়ার ডাক অর্থাৎ, ঘোড়ার সাহায্যে দ্রুত ডাক চলাচলের চমৎকার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
৪. সামরিক ও বিচার ব্যবস্থা
আলাউদ্দিন খলজির মতো শেরশাহও সৈন্যদের চেহারা ও বিবরণ লিখে রাখার প্রথা (হুলিয়া) এবং ঘোড়াকে চিহ্নিত করার জন্য দাগ দেওয়ার প্রথা (দাগ প্রথা) পুনরায় কঠোরভাবে চালু করেন, যাতে সেনাবাহিনীতে কোনো দুর্নীতি না হয়। বিচার ব্যবস্থায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নিরপেক্ষ। তাঁর কাছে ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার জন্য একই আইন ছিল।
স্থাপত্য ও নির্মাণকাজ
শেরশাহ একজন বড়মাপের স্থপতি ও নির্মাতা ছিলেন। তাঁর নির্মিত স্থাপত্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
সাসারামের সমাধিসৌধ: বিহারের সাসারামে একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে লাল বেলেপাথরে নির্মিত তাঁর নিজের সমাধিসৌধটি ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক অনবদ্য নিদর্শন।
-
পুরানা কিলা: দিল্লির ‘পুরানা কিলা’ বা পুরনো দুর্গ মূলত তাঁরই নির্মিত।
-
কিলা-ই-কুহনা মসজিদ: পুরানা কিলার ভেতরে অবস্থিত এই মসজিদটি তার চমৎকার নকশা এবং কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত।
-
রোহতাসগড় দুর্গ: বিহারে এবং বর্তমান পাকিস্তানের ঝিলমে তিনি অত্যন্ত সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণ করেন।
শেরশাহ কিভাবে মারা যান?
১৫৪৫ সালে রাজপুতদের কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শেরশাহের মৃত্যু হয়। দুর্গের দেয়াল লক্ষ্য করে কামানের গোলা নিক্ষেপ করার সময় একটি গোলা দেয়ালে বাধা পেয়ে ফিরে এসে বারুদের স্তূপে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে শেরশাহ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। ২২ মে ১৫৪৫ তারিখে দুর্গটি বিজয়ের সংবাদ শোনার কিছুক্ষণ পরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র জালাল খান ‘ইসলাম শাহ সুরি’ নাম ধারণ করে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারীরা ছিলেন অযোগ্য ও দুর্বল। ফলে ১৫৫৫ সালে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন পুনরায় ভারত আক্রমণ করে সুরিদের পরাজিত করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।
মূল্যায়ন
ঐতিহাসিকরা শেরশাহ সুরিকেকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি হিসেবে আকবরকে ধরা হলেও, আকবরের প্রশাসনিক কাঠামোর মূল ভিত্তি মূলত শেরশাহই তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। উইলিয়াম এরস্কিনের মতে, “শেরশাহের চেয়ে অধিকতর দূরদর্শী, বিচক্ষণ এবং প্রজাদরদী শাসক প্রাচ্যে খুব কমই জন্মগ্রহণ করেছেন।”