ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর হলো ফিফা বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে কাতারের মরুভূমিতে অনুষ্ঠিত ২২তম বিশ্বকাপটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর টুর্নামেন্ট হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই আসরে শুধু দলগত লড়াই-ই জমেনি, বরং ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারদের মধ্যেও চলেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বিশেষ করে, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার “গোল্ডেন বুট” (Golden Boot) জয়ের লড়াইটি রূপ নিয়েছিল এক মহাকাব্যিক নাটকে।
আপনি কি জানতে চান ২০২২ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা কে? কিংবা গোলদাতার তালিকায় শীর্ষস্থানে কারা ছিলেন? আজকের এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা ২০২২ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকা (Top Scorers of FIFA World Cup 2022), অ্যাসিস্টের সংখ্যা এবং গোল্ডেন বুটের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
২০২২ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকা (শীর্ষ ১০)
কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্সের ফাইনাল ম্যাচটি ছিল এক অনবদ্য ড্রামা। ফাইনালের আগ পর্যন্ত গোল্ডেন বুটের তালিকায় কিলিয়ান এমবাপে এবং লিওনেল মেসি সমান ৫টি করে গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন। তবে ফাইনালের হ্যাটট্রিক পুরো সমীকরণ বদলে দেয়। নিচে ২০২২ বিশ্বকাপের শীর্ষ গোলদাতাদের সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া হলো:
১. কিলিয়ান এমবাপে (Kylian Mbappé) – গোল্ডেন বুট জয়ী
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার “গোল্ডেন বুট” নিজের নামে করে নেন ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে টুর্নামেন্টজুড়ে তার পারফরম্যান্স ছিল অবিশ্বাস্য।
ফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্স ৩-৩ গোলে ড্র করার পেছনে এমবাপের হ্যাটট্রিক ছিল মূল চালিকাশক্তি। ১৯৬৬ সালের পর তিনি প্রথম খেলোয়াড় যিনি বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন। যদিও তার দল ট্রফি জিততে পারেনি, তবে ব্যক্তিগত দক্ষতায় তিনি ফুটবল বিশ্বে নিজের আধিপত্য পুনরুত্থিত করেছেন।
২. লিওনেল মেসি (Lionel Messi) – সিলভার বুট ও গোল্ডেন বল জয়ী
আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেওয়ার রূপকার ছিলেন মহাতারকা লিওনেল মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ৭টি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে আরও ৩টি গোল করান (অ্যাসিস্ট)।
মেসি ২০২২ বিশ্বকাপে মোট ৭টি ম্যাচের মধ্যে ৬টিতেই গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েন। নকআউট পর্বের প্রতিটা ধাপে (শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল) গোল করা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় তিনি। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তিনি “গোল্ডেন বল” (Golden Ball) লাভ করেন।
৩. অলিভিয়ের জিরু ও হুলিয়ান আলভারেজ (৪টি করে গোল)
শীর্ষ দুই জনের পর যৌথভাবে ৪টি করে গোল নিয়ে তালিকায় তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে আছেন ফ্রান্সের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার অলিভিয়ের জিরু এবং আর্জেন্টিনার তরুণ তুর্কি হুলিয়ান আলভারেজ।
- অলিভিয়ের জিরু: করিম বেনজেমার ইনজুরির কারণে দলে সুযোগ পেয়ে জিরু ফ্রান্সের আক্রমণে দারুণ ভূমিকা রাখেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলটি ছিল অন্যতম সেরা।
- হুলিয়ান আলভারেজ: টুর্নামেন্টের শুরুতে বেঞ্চে থাকলেও লউতারো মার্তিনেসের অফ-ফর্মের কারণে মূল একাদশে জায়গা পান তিনি। সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে তার জোড়া গোল আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে বড় সাহায্য করেছিল।
৩টি করে গোল করেছেন যারা
২০২২ বিশ্বকাপে ৩টি করে গোল করেছেন মোট ৭ জন খেলোয়াড়। তাদের মধ্যে এনর ভ্যালেন্সিয়া (ইকুয়েডর) গ্রুপ পর্বেই ৩টি গোল করে বিদায় নেন। অন্য ছিটকে যাওয়া তারকাদের মধ্যে আছেন:
- কোডি গাকপো (নেদারল্যান্ডস): গ্রুপ পর্বের টানা তিন ম্যাচেই গোল করে ডাচদের নকআউটে তোলেন।
- গনসালো রামোস (পর্তুগাল): নকআউট পর্বে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পরিবর্তে খেলতে নেমে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আসরের প্রথম হ্যাটট্রিকটি করেন এই তরুণ।
- মার্কাস র্যাশফোর্ড ও বুকায়ো সাকা: ইংল্যান্ডের হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত অসাধারণ খেলেছেন এই দুই ফরওয়ার্ড।
গোল্ডেন বুটের টাই-ব্রেকার নিয়ম কী ছিল?
যদি দুই বা ততোধিক খেলোয়াড়ের গোল সংখ্যা সমান হয়, তবে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী টাই-ব্রেকারের মাধ্যমে গোল্ডেন বুট জয়ী নির্ধারণ করা হয়। নিয়মটি নিচে দেওয়া হলো:
- অ্যাসিস্ট সংখ্যা: পেনাল্টি ছাড়া বা পেনাল্টিসহ সতীর্থদের গোল করতে সবচেয়ে বেশি কে সাহায্য করেছেন, তা দেখা হয়।
- খেলার সময় (Minutes Played): যদি গোল এবং অ্যাসিস্ট দুটিই সমান হয়, তবে যে খেলোয়াড় মাঠে সবচেয়ে কম সময় খেলেছেন (যার গোলের অনুপাত বেশি), তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০২২ বিশ্বকাপে এমবাপে সরাসরি ৮ গোল করায় কোনো টাই-ব্রেকারের প্রয়োজন পড়েনি। তবে মেসি ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট নিয়ে সিলভার বুট নিশ্চিত করেন।
কাতার বিশ্বকাপের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
- মোট গোল সংখ্যা: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৬৪টি ম্যাচে সর্বমোট ১৭২টি গোল হয়েছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড (এর আগে ১৯৯৮ ও ২০১৪ আসরে ১৭১টি গোল হয়েছিল)।
- ম্যাচ প্রতি গোলের গড়: ২.৬৯টি।
- প্রথম গোলদাতা: ইকুয়েডরের এনার ভ্যালেন্সিয়া (স্বাগতিক কাতারের বিপক্ষে)।
-
সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা: পেপে (পর্তুগাল), ৩৯ বছর ২৯৭ দিন বয়সে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করেন।
শেষ কথা
২০২২ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল অভিজ্ঞ তারকা ও উদীয়মান তরুণদের এক অপূর্ব সমন্বয়। কিলিয়ান এমবাপের অতিমানবীয় গতি আর লিওনেল মেসির জাদুকরী ফুটবল শৈলী কাতার বিশ্বকাপকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে। এই কন্টেন্টটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করতে ভুলবেন না। ফুটবল দুনিয়ার এমন আরও আকর্ষণীয় আপডেট ও পরিসংখ্যান পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন lekhok.me।
