বৃষ্টি পড়ছে চুপচাপ

0

বৃষ্টি পড়ছে চুপচাপ। জানালার পাশে বসে নীলা তাকিয়ে আছে বাইরে। চারপাশে কুয়াশার মতো ঘোলা ধোঁয়া, আর তার ভেতর দিয়ে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ধারা—যেন প্রতিটি ফোঁটা তার ভিতরে জমে থাকা একেকটা অভিমান। এই শহরে সে অনেক দিন ধরে আছে, অথচ আজও কেউ তাকে “নিজের” বলে ডাকেনি।

নীলা ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। ক্লাস ফাইভে স্কলারশিপ, ক্লাস এইটে বোর্ডে মেধা তালিকায় নাম, এসএসসি-এইচএসসি তে গোল্ডেন। কিন্তু এই প্রতিটি অর্জনের দিনে তার মা রান্নাঘরে মুখ বাঁকিয়ে বলত, “মেয়ে হয়ে পড়লে কী হবে? শেষে তো একটা পাত্রের জন্য বসে থাকতে হবে!” আর ভাইটা বলত, “ছোটলোকি স্বপ্ন দেখে লাভ নাই।” তারা চেয়েছিল সে কাজকর্ম করুক, সংসারে টাকা আনুক। নীলা এসব শুনে চুপচাপ বইয়ে মুখ গুঁজে রাখত। প্রতিদিন ভোরে উঠত, ঘর মুছত, রান্না করত, তারপর পড়তে বসত। পরিবারের কেউ কখনও তাকে জিজ্ঞেস করেনি, সে কেমন আছে।

কিন্তু নীলা ভেঙে পড়েনি। সে জানত, কোনোদিন কেউ তাকে গড়ে দেবে না, তাকে নিজেকেই নিজে গড়তে হবে।

সেই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় শুরু হয় গল্পের মোড় ঘোরা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছিল সে, এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে পুরোনো বইয়ের ব্যাগ। হঠাৎ পেছন থেকে এক চিৎকার—“খুন! খুন হইছে!” ভিড় ঠেলে গিয়ে দেখে, পাশের ফ্ল্যাটের অ্যাডভোকেট সাহেব মৃত। দরজা ভিতর থেকে আটকানো, জানালা বন্ধ, কোনো চিৎকার শোনা যায়নি, কিন্তু লোকটা গলা চেপে খুন হয়েছে। পুলিশের ভাষায়—বদ্ধ ঘরে রহস্যজনক মৃত্যু।

সবার চোখে কৌতূহল, ভয়ের ছায়া। আর নীলার চোখে? এক ধরনের অন্য রকম দীপ্তি। তার মস্তিষ্ক তখন কাজ করছে একটা অপরাধ বিশ্লেষকের মতো। সে ভাবে, ‘একটা খুন, যার দরজা ভেতর থেকে লকড, অথচ হত্যাকারী নেই—এটা অসম্ভব না, অসম্পূর্ণ।’

সে রাতে ঘরে ফিরে নীলা তার পুরোনো খাতাটা খুলে বসে। ছোটবেলা থেকেই ক্রাইম রিপোর্ট, রহস্য গল্প, আইন-বিচার এসব তার নেশা। বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা প্যাটার্ন খুঁজে বের করে—বদ্ধ ঘরে খুনের কেসে সবসময় একটা ছোট ক্লু থাকে, যেটা সবাই উপেক্ষা করে।

পরদিন সে চলে যায় খুন হওয়া ফ্ল্যাটের দারোয়ানের কাছে। জিজ্ঞেস করে, “সেদিন রাত ১১টার পর কেউ এসেছিল?”
দারোয়ান বলে, “না মিস, আলো নিভে যায়। পরে একজন হোম সার্ভিসে আসে অ্যাডভোকেট সাহেবের ড্রাইভার সেজে, বলে তার কিছু দরকার। কিন্তু ও তো বাইরেই গেল না।”

নীলা চুপ করে সব নোট নেয়। এরপর খুঁজে খুঁজে খুন হওয়া অ্যাডভোকেটের অফিস যায়, পুরোনো ফাইল পড়ে। জানতে পারে, তিনি একটা মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করছিলেন। যেই মামলায় জড়িত ছিল একজন নামকরা ব্যবসায়ী এবং এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাই।

তবে এই অনুসন্ধান সহজ ছিল না। একদিন এক অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে:
“তুই যদি বেশি জানিস, তোর জীবনও থেমে যাবে।”

নীলা ভয় পায় না। বরং আরও সাহসী হয়। সে জানে, পুলিশ এসব নেবে না, তার নিজেরই কিছু করতে হবে।

তিন দিন পর, গভীর রাতে, ঘরে ঢুকে পড়ে একজন। মুখে মাস্ক, হাতে ছুরি। সে বলে, “তোর গন্ধ আমি বুঝি নিইছি। আজ শেষ করব।”
নীলা জানত কেউ আসবে। তাই আগেই রেকর্ডার চালু করে রেখেছিল, একটা পুরোনো মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে জানালার ওপাশে ভিডিও করছিল।

ছুরি হাতে লোকটা এগিয়ে আসে, তখনই নীলা বলে, “তোকে আমি চিনে ফেলেছি। তুই ড্রাইভার না, তুই সেই ব্যবসায়ীর দেহরক্ষী, যেই ফোন দিয়ে আমায় হুমকি দিস। ক্যামেরা সব রেকর্ড করছে। পালা।”
লোকটা স্তব্ধ। বুঝে যায়—খেলা শেষ।

পরদিন পুলিশ এসে লোকটিকে ধরে। নীলা তার সংগ্রহ করা সমস্ত ডকুমেন্ট, ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করে। মিডিয়ায় হইচই পড়ে যায়—“এক মেয়ে একা হাতে খুনের রহস্য ফাঁস করল।” পুরস্কার ঘোষণা হয়, পত্রিকায় ছবি ছাপে।

তবে এসবের মাঝেও তার পরিবার ছিল চুপ। মা একদিন শুধু বলেছিল, “তুই যেগুলা করিস, সেগুলা ভালো মেয়েরা করে না।”
নীলা আর কোনো উত্তর দেয়নি। আর কখনো সে ঘরটায় ফেরেনি।
সেই ছোট বদ্ধ রুম, সেই টিনের ছাদ, সেই কর্কশ গলা আর দুঃসহ দিনগুলো—সব পেছনে ফেলে নীলা চলে যায় সামনে।

এক বছর পর, বৃষ্টির ঠিক এমন এক দিনে, সে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশের পোশাকে। তার চোখে আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটে তুচ্ছ একটা হাসি। দূরে কোথাও তার মা হয়তো টিভির খবর দেখছে—“অসহায় মেয়ে আজ পুলিশ অফিসার।”
কিন্তু নীলা জানে, তার জয়ের কোনো উদযাপন পরিবারের দরকার নেই। সে কেবল নিজের জন্য লড়েছে, নিজের জন্য জিতেছে। আজ তাকে ভালোবাসে লাখো মানুষ, কিন্তু সে জানে—আদতে, একা লড়াই করলেই মানুষ নিজের হয়ে ওঠে।

বৃষ্টি এখনও পড়ছে চুপচাপ, আগের মতোই।
তবে আজ আর সে জানালার পাশে বসে কাঁদে না।
আজ সে দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টির মাঝে, সোজা হয়ে, বুক তুলে, নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে।


56
বিজ্ঞাপনঃ মিসির আলি সমগ্র ১: ১০০০ টাকা(১৪% ছাড়ে ৮৬০)

0

Nazia Sultana

Author: Nazia Sultana

"সাহিত্যে ডুবে থাকা একজন নিবেদিত লেখক আমি।"

নিচের লেখাগুলো আপনার পছন্দ হতে পারে

প্রতি দান

রাতে থেকে বৃষ্টি হচ্ছিলো, কিছুক্ষণ,বৃষ্টি থেমেছে সবে। সকাল কখন হয়েছে চম্পা জানে না। চম্পা শুনেছে, ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র

অ্যাথেনার অলৌকিক হার্প

অনেক অনেক বছর আগে, প্রাচীন গ্রিসের এক ছোট্ট গ্রামে বাস করত এক কিশোরী মেয়ে—নাইরা। সে দরিদ্র ছিল, কিন্তু তার গলায়

নীলচোখা জলপরী

শঙ্খনদী গ্রামের সকাল সবসময় সমুদ্রের শব্দ দিয়ে শুরু হয়। মাটির ঘরগুলোর চালের ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢোকে, আর বাতাসের সাথে ভেসে

সময়ের দরজা

মেঘে ঢাকা এক বিকেল। পুরান ঢাকার সরু গলির ভেতরে, ধুলো ধরা এক প্রাচীন বইয়ের দোকানে ঢুকল আরসোহা। ইতিহাসের ছাত্রী সে,

Leave a Reply