0
ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ একটি যুদ্ধের প্রাক্কালে তার সেনাপতি মানসুর বিন গালিবের উদ্দেশ্যে একটি উপদেশপূর্ণ চিঠি প্রেরণ করেন। এ চিঠিটি কেবল একজন খলিফার নির্দেশনা নয়, বরং তা ছিল একটি জাতির আত্মিক জাগরণ ও ইমানি চেতনার দীপ্ত দলিল। প্রখ্যাত আলেম ও সাহিত্যিক সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী তার ‘মুখতারাত মিন আদাবিল আরব’ গ্রন্থে এ চিঠিকে অমর করে রেখেছেন।
চিঠিতে খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ যুদ্ধজয়ের বাহ্যিক উপকরণের চেয়ে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর আনুগত্যকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন:
“আল্লাহর নাফরমানিতে যদি তোমরা ও তোমাদের শত্রুরা সমান হয়ে যাও, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য তোমাদের ভাগ্যে আসবে না। তোমাদের যুদ্ধসরঞ্জাম শত্রুর তুলনায় তুচ্ছ।”
এমনকি তিনি সেনাপতিকে এ কথাও বলেন:
“তুমি নিজের গুনাহের চেয়ে শত্রুর শত্রুতার প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ো না। নিজেদের গোনাহের জন্য যেমনভাবে আল্লাহর আশ্রয় চাও, শত্রুর আক্রমণ থেকেও তেমনই পানাহ চাও।”
এই নির্দেশনা নিছক কৌশলগত নয়—এ এক আত্মিক ঘোষণা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করার পূর্বে আত্মশত্রুকে পরাজিত করাই প্রকৃত বিজয়ের পূর্বশর্ত।
ইসলামের ইতিহাসের প্রতিটি বিজয়ই প্রমাণ করে, মুসলমানরা যখন আত্মসমালোচনায় মনোযোগী ছিল, আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকত, তখনই তারা তাদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছে। বদর, খায়বর, ইয়ারমুক, কাদিসিয়া—এইসব বিজয় ছিল আত্মিক প্রস্তুতির ফল।
তারা শত্রুর চেয়ে নিজেদের গোনাহকে বেশি ভয় করত। শত্রুর চক্রান্তের চেয়ে আল্লাহর গজব তাদের কাছে বেশি আশঙ্কার বিষয় ছিল। তারা নিজেদের অন্তর পরিষ্কার না করে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করত না।
আজকের মুসলিম উম্মাহ সেই আত্মিক জাগরণ ভুলে গিয়ে, অন্যের গোনাহ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিজে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, প্রতিবেশীর হক নষ্ট করে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গিয়ে—অন্য জাতির সমালোচনায় লিপ্ত। অথচ খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ হুঁশিয়ার করেছিলেন:
“তোমাদের গোনাহের কারণে আল্লাহ তোমাদের উপর তোমাদের চেয়ে নিকৃষ্ট জাতিকে চাপিয়ে দিতে পারেন।”
এ হুঁশিয়ারি আজ সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। মুসলিম জাতি আজ নিজের গোনাহ ভুলে গিয়ে অন্যের দোষ নিয়ে ব্যস্ত। তারা রাসূলে (সা.)’র শানে শ্রদ্ধা দেখাতে ব্যর্থ, তাঁর সুন্নাহ পরিত্যাগ করে, অথচ আশা করে বিজয়ের।
আল্লাহর সবচেয়ে বড় অবাধ্যতা তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে গোস্তাখি করা। “قل لا أسألكم عليه أجراً إلا المودة في القربى” – এই আয়াতকে অগ্রাহ্য করে, যারা রাসূলের পরিবার ও প্রতিনিধিদের সাথে বেয়াদবি করে, তারা কিভাবে আল্লাহর সাহায্য আশা করে?
মুসলিম উম্মাহর উত্থান সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তারা নিজেদের দোষ, গোনাহ ও আত্মিক দূষণকে চিহ্নিত করে তা সংশোধনে মনোযোগী হবে। আল্লাহর আনুগত্য, রাসূলের শানে সর্বোচ্চ সম্মান, তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ এবং অন্তরের গোনাহ থেকে মুক্তি ছাড়া কোনো বিজয় সম্ভব নয়।
আজ আমাদের প্রয়োজন—খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজের চিঠির মতো আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের ভেতরের শত্রুকে পরাজিত করতে না পারলে, বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা কখনোই বিজয়ী হতে পারব না।

0