বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল (৯ম পে স্কেল) নিয়ে ২০২৬ সালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৫ সালের সর্বশেষ পে স্কেলের পর দীর্ঘ ১১ বছর পর এই নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য ও আপডেট অনুযায়ী ৯ম পে স্কেল সম্পর্কে মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
আগামী ১ জুলাই থেকেই কার্যকর (নীতিগত সিদ্ধান্ত)
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের পুনর্গঠিত কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ (২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন) থেকেই নতুন ৯ম পে স্কেল কার্যকর করা হবে।
-
ঘোষণার অপেক্ষা: আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ করে চূড়ান্ত গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হতে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গেজেট যখনই হোক—কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকেই এবং কর্মচারীরা বকেয়াসহ (Arrears) নতুন বেতন পাবেন।
-
বাজেট বরাদ্দ: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন পে স্কেলের আর্থিক চাপ সামলাতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
১. মূল সুপারিশ ও বেতন বৃদ্ধি
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন বিগত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন গড়ে ১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
-
সর্বনিম্ন বেতন (২০তম গ্রেড): বর্তমানের ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে (প্রায় ১৪২% বৃদ্ধি)।
-
সর্বোচ্চ বেতন (১ম গ্রেড): বর্তমানের ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
-
বেতনের অনুপাত: উচ্চ ও নিম্ন পদের বেতনের বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
২. বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার পুরো পে স্কেল একবারে কার্যকর না করে ৩টি আলাদা ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে:
-
প্রথম ধাপ (১ জুলাই ২০২৬ থেকে): আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন (১ জুলাই) থেকেই নতুন পে স্কেল আংশিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে। প্রথম বছরে মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ (সম্ভাব্য ৫০%) বৃদ্ধি পেতে পারে।
-
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি অংশ পুরোপুরি সমন্বয় করা হবে।
-
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং অন্যান্য সব ভাতা নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।
৩. ভাতা ও অন্যান্য নতুন সুবিধা
-
টিফিন ভাতা: বর্তমানের ২০০ টাকা থেকে ৫ গুণ বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
স্বাস্থ্য বীমা: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রথমবারের মতো সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা চালু করার সুপারিশ রয়েছে।
-
প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা: প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ২,০০০ টাকা বিশেষ ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
মহার্ঘ ভাতার সমন্বয়: কর্মচারীরা বর্তমানে যে ১০% মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন, তা নতুন পে স্কেলের মূল বেতনের সাথে সমন্বয় করা হবে।
৪. পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর
নতুন পে স্কেলে দেশের প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্যও বড় পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে যাদের মাসিক পেনশন ২০,০০০ টাকার নিচে, তাদের পেনশন ১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ৭৫ বছরের ঊর্ধ্বের পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক ১০,০০০ টাকা চিকিৎসা ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের বিতর্ক ও অসন্তোষ: মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৯ম পে স্কেলের একটি খসড়া গ্রেড-তালিকা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, উচ্চতর গ্রেডগুলোর (১-১০ গ্রেড) পারস্পরিক বেতনের ব্যবধান অনেক বেশি (যেমন গ্রেড ১ ও ২ এর তফাত ২৮,০০০ টাকা), অথচ নিম্ন গ্রেডগুলোর ব্যবধান খুবই সামান্য (যেমন ১২ ও ১৩ নম্বর গ্রেডের তফাত মাত্র ৩০০ টাকা)। এটি নিয়ে কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে, যা বর্তমানে সচিব কমিটি পর্যালোচনা করে দেখছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও অসন্তোষ:
যদিও এই পে স্কেল নিয়ে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের আশা করা হচ্ছে, তবে সম্প্রতি (মে ২০২৬-এর দিকে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর খসড়া গ্রেড-ভিত্তিক তালিকা ছড়িয়ে পড়ার পর কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের দাবি, উচ্চতর গ্রেডগুলোর তুলনায় নিচের গ্রেডগুলোর পারস্পরিক বেতনের ব্যবধান (যেমন কিছু ক্ষেত্রে গ্রেড পরিবর্তনের আর্থিক তফাত মাত্র ৩০০ টাকার মতো) অনেক কম, যা এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে।
বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি এই পুরো প্রস্তাবনাটি পর্যালোচনা করছে, যা আগামী জুনের বাজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়ে জুলাই থেকে কার্যকরের কথা রয়েছে।
