গল্প

0

#গল্প
রূপকথা
আফছানা খানম অথৈ

পৃথিবীর সব প্রেমই কি পূর্ণতা পায়? কিছু প্রেম জন্ম নেয় শুধু হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে, নিঃশব্দে বেড়ে ওঠে, আর একদিন না-বলা কথার ভারে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়।
রূপকথা—নামের মতোই সে ছিল স্বপ্নের এক রাজকন্যা। তার চোখে ছিল শ্রাবণের গভীরতা, হাসিতে ছিল ফাগুনের রঙ, আর কণ্ঠে ছিল মায়াভরা এক কোমল সুর। তাকে প্রথম দেখার পর থেকেই আয়ানের মনে হয়েছিল, এই মেয়েটিই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তারা। প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়ার আগে আয়ানের প্রথম কাজ ছিল রূপকথাকে একবার দেখা। করিডোরে হেঁটে যাওয়া, লাইব্রেরির নীরব কোণে বসে বই পড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে হাসিমুখে গল্প করা—রূপকথার প্রতিটি মুহূর্তই আয়ানের চোখে ছিল একেকটি জীবন্ত ছবি।
ভালোবাসা ধীরে ধীরে তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে শেকড় গেড়ে বসল। কিন্তু সেই ভালোবাসার কথা বলার সাহস কখনো জোগাড় করতে পারল না সে।
কতবার ভেবেছে—আজ বলবে। কতবার লাল গোলাপ কিনেছে। কিন্তু রূপকথার সামনে দাঁড়ালেই বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যেত, ঠোঁট কাঁপত, আর সব কথা গলায় আটকে যেত।
রাতের পর রাত আয়ান ডায়েরিতে লিখত শুধু একটি নাম—রূপকথা। তার সব কবিতা, সব স্বপ্ন, সব প্রার্থনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেই একটিমাত্র মানুষ।
বন্ধুরা বলত,

—”যাকে এত ভালোবাসিস, তাকে বল। দেরি করিস না।”
আয়ান মৃদু হেসে বলত,
—”আমি চাই, ওকে এমনভাবে ভালোবাসার কথা বলব, যাতে ওর চোখে শুধু আনন্দের জলই ঝরে।”
কিন্তু ভাগ্য যেন তার জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
এক বিকেলে আয়ান সাহস সঞ্চয় করল। শহরের একটি নিরিবিলি পার্কে রূপকথাকে দেখা করতে বলল। আকাশে কালো মেঘ, হালকা বৃষ্টি, বাতাসে কদমফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ—প্রকৃতিও যেন এক প্রেমের স্বীকারোক্তির অপেক্ষায়।
রূপকথা আসতেই আয়ানের বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল। কাঁপা হাতে একটি লাল গোলাপ এগিয়ে দিয়ে সে বলল,
“রূপকথা, অনেক দিন ধরে আমার হৃদয়ে একটা নামই বেঁচে আছে—তোমার নাম। তোমাকে ছাড়া আমি কোনো স্বপ্ন দেখি না, কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা করি না। তোমার হাসিতে আমি বাঁচতে শিখেছি, তোমার অপেক্ষায় দিন গুনেছি। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি কি আমার জীবনের সঙ্গী হবে?”
কথাগুলো বলেই আয়ান নিশ্বাস বন্ধ করে উত্তর শোনার অপেক্ষায় রইল।

রূপকথা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তার বড় বড় চোখ দুটি মুহূর্তেই অশ্রুতে ভরে উঠল। ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছিল না।
অবশেষে সে খুব আস্তে বলল,
“আয়ান… তুমি এত দেরি করলে কেন?”
একটি মাত্র প্রশ্ন যেন হাজার ছুরির আঘাত হয়ে বিঁধল আয়ানের বুকে।
রূপকথা চোখের জল মুছে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো একদিন তুমি বলবে।
অনেকবার তোমার চোখে না-বলা কিছু কথা দেখেছি। কিন্তু তুমি কখনো মুখ ফুটে কিছু বলোনি। আর আজ… আজ সব শেষ হয়ে গেছে। পরিবারের পছন্দে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামী মাসেই আমার বিয়ে।”
কথাগুলো শুনেই আয়ানের হাত থেকে গোলাপটি মাটিতে পড়ে গেল।
মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন এক মুহূর্তে সব আলো নিভিয়ে দিয়েছে। হাজারো স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
তার সেই কান্না দেখে রূপকথার চোখ থেকেও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল,
“বিশ্বাস করো, যদি আজকের এই কথাগুলো কয়েক মাস আগে বলতে, আমি কখনো তোমাকে ফিরিয়ে দিতাম না। হয়তো আজ আমার হাতেই থাকত তোমার দেওয়া এই গোলাপ।”
আয়ান ভেজা চোখে মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসা হেরে যায়নি, হেরে গেছে আমার সাহস। সময়ের কাছে হেরে গেলাম আমি।”

ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে প্রবল বৃষ্টি নামল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও যেন তাদের অপূর্ণ প্রেমের সাক্ষী হয়ে অশ্রু ঝরাচ্ছে।
বিদায়ের আগে রূপকথা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মাটিতে পড়ে থাকা গোলাপটি তুলে আয়ানের হাতে দিয়ে বলল,
“এই ফুলটা শুকিয়ে যাবে, কিন্তু তোমার ভালোবাসা কোনোদিন শুকাবে না। যদি কখনো আমাকে মনে পড়ে, ঘৃণা কোরো না। শুধু দোয়া করো, আমি যেন ভালো থাকি।”
আয়ান আর কিছু বলতে পারল না। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেল পৃথিবী। শুধু নীরবে তাকিয়ে রইল রূপকথার চলে যাওয়ার পথে।

সেদিনের পর বহু বছর কেটে গেছে। সময় অনেক ক্ষত শুকিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রথম ভালোবাসার দাগটি আজও মুছে যায়নি। আজও কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে কদমফুলের ঘ্রাণ পেলেই আয়ানের মনে পড়ে যায় সেই মেয়েটির কথা—যার নাম ছিল রূপকথা।
কিছু ভালোবাসা মিলনের জন্য জন্মায় না। তারা জন্মায় মানুষের হৃদয়কে আরও গভীর, আরও পবিত্র করে তোলার জন্য। আর সেই ভালোবাসাই একদিন নীরবে রূপ নেয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর,অথচ সবচেয়ে বেদনাময় রূপকথায়।

ঃসমাপ্তঃ


56
বিজ্ঞাপনঃ মিসির আলি সমগ্র ১: ১০০০ টাকা(১৪% ছাড়ে ৮৬০)

0

Afsana Khanam

Author: Afsana Khanam

লেখক

নিচের লেখাগুলো আপনার পছন্দ হতে পারে

অনন্ত প্রস্থান

কিসের জন্য এই ধরাতে মানুষ রূপে আসা, যেতেই হবে জেনেও তবে বাঁধো মোহের বাসা। মিথ্যে মায়ার এই বাঁধনে বৃথাই মরি

কবিতা কষ্টে ঘেরা জীবন আফছানা খানম অথৈ

কবিতা কষ্টে ঘেরা জীবন আফছানা খানম অথৈ কষ্ট ঘেরা জীবন মোদের, কেউ দেখে না ফিরে, দুঃখের বোঝা মাথায় নিয়ে চলি

বিবেক-অন্ধ জাতি

কালিমার ওই মর্ম বেদীন ওরা বুঝলো ঠিক। বিপথগামী জাতির প্রতি ছড়াল শত ধিক। এই কালিমার নিশান রেখে অন্য নিশান ধরে,

Leave a Reply