মৌরির উপকারিতা

মৌরির উপকারিতা ও অপকারিতা

play icon Listen to this article
0

আমাদের রান্নাঘরে সবচেয়ে পরিচিত একটি মসলা মৌরি। এটি অতি ক্ষুদ্র বীজ জাতীয় মসলা, যার চাষ সারা বাংলাদেশেই হয়ে থাকে। প্রাচীনকাল থেকে মৌরিকে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আজকে জানবো মৌরির উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত।

মৌরি কি?

মৌরি এক প্রকার বীজ, যা আমরা মসলা হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। মৌরি আকারে খুব ক্ষুদ্র, দেখতে অনেকটা লম্বা বেলনের মত, যার দুই ধার ক্রমশ সরু। মৌরি এমনি এমনি খেয়ে ফেলা যায়, আলাদাভাবে রান্না করার কোনো প্রয়োজন হয় না।

মৌরির উপকারিতা

মাত্র কয়েকটি মৌরি কয়েকবার চাবিয়ে খেলেই আমাদের মুখে সজীবতা ফিরে পায় এবং দুর্গন্ধ তাৎক্ষণিকভাবে দূর হয়। মৌরি বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত উপমহাদেশের প্রত্যেকটি দেশেই উৎপাদন করা হয়। ভেষজ গুণাবলী সম্পন্ন মৌরিকে প্রাচীন ভেষজ শাস্ত্রে প্রাকৃতিক ওষুধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আজকে মৌরির উপকারিতা সম্পর্কে জানবো।

মৌরির উপকারিতা

এখন মৌরির উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মৌরিকে একটি ভেষজ ওষুধ হিসেবে জেনে আসছে। যদিও আমরা এটিকে বৃহৎ পরিসরে মসলা হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। মৌরি খেলে কি হয় তা জানতে হলে মৌরির নানাবিধ স্বাস্থ্যকর গুণাবলীগুলো পড়ে ফেলুন।

১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

মৌরিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নামের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। আমরা জানি, আমাদের চারপাশে নানা রকম ক্ষতিকর জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া উপস্থিত। এগুলো আমাদের শরীরকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করে থাকে। তারপরেও মানুষের মানুষের শরীর এই সকল জীবানুকে খুব সহজে প্রতিহত করে।

এর পেছনে মূলত কাজ করে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নামক উপাদানটি। মজার ব্যাপার হচ্ছে মৌরিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রাপ্যতা অনেক বেশি। যা গ্রহণ করলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।

২. সজীবতা বৃদ্ধি করে

কয়েকটি মৌরি চিবিয়ে খেলে আমরা যেন দ্রুতই সজীবতা ফিরে পাই। মৌরি স্বাদ ও গন্ধ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হওয়ায় এটি আমাদের শরীরে সজীবতা বৃদ্ধি করে এবং শক্তি প্রদান করে। এছাড়া মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে মৌরির কোনো বিকল্প নেই। মৌরি একটি প্রাকৃতিক মাউথ ফ্রেশনার।

৩. হৃদরোগ প্রতিহত করে

মৌরিতে রয়েছে পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। পটাশিয়াম আমাদের শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখলে আমাদের হৃদপিণ্ড সুস্থ থাকে এবং হৃদরোগের আশঙ্কা অনেকাংশই কমে যায়।

৪. চোখের সুস্বাস্থ্যতা নিশ্চিত করে

চোখের জন্য মৌরি খাওয়া খুবই উপকারী। মৌরিতে রয়েছে ভিটামিন এ। ভিটামিন এ আমাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে এবং চোখ সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। তাই যাদের চোখের সমস্যা এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, তাদের জন্য মৌরি খাওয়া অনেকটাই লাভজনক হতে পারে।

৫. ওজন কমায়

মৌরি আমাদের হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। যার কারণে খাবার শেষে অনেক সময় মৌরি আলাদাভাবে পরিবেশন করতে দেখা যায়। এছাড়া মৌরি শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করে। মৌরিতে উপস্থিত খনিজ উপাদানগুলো শরীরে জমা ক্ষতিকর মেদ অপসরণ করতে সাহায্য করে।

তাই যারা পেটে নানা রকম সমস্যায় ভুগছেন এবং ওজন কমানোর কথা চিন্তা-ভাবনা করছেন, তাদের জন্য মৌরি একটি জাদুকরী ওষুধ হতে চলেছে।

মৌরি কিভাবে খেতে হয়

মৌরি পানিতে ভিজিয়ে কিংবা শরবত বানিয়ে খাওয়া উচিত। এতে মৌরিতে থাকা প্রত্যেকটি খনিজ উপাদান পানিতে বা শরবতে মিশে যায়। যখন এই পানি বা শরবত আমরা গ্রহণ করি তখন মৌরিতে থাকা প্রত্যেকটি খনিজ উপাদান সর্বোচ্চ পরিমাণ আমাদের শরীর শোষণ করতে সুবিধা হয়।

রাতে এক গ্লাস পানিতে কিছু মৌরি ফেলে দিলে পরের দিন সকালে তা গ্রহণ করতে পারেন। আর মৌরি গুঁড়ো করে পানিতে মিশিয়ে এতে চিনি যোগ করেও খাওয়া যেতে পারে। এই শরবত খেলে মৌরির উপকারিতা দেখতে পেতে সাত দিনও লাগবে না।

কাঁচা মৌরির উপকারিতা ও অপকারিতা

বেশিরভাগ পুষ্টিবিজ্ঞানীরা মৌরিকে কাঁচা অবস্থায় খেতে বলেছেন। কারণ ভেজে খাওয়ার চেয়ে কাঁচা মৌরির উপকারিতা রয়েছে। আমরা জেনেছি মৌরির মধ্যে ভিটামিন এ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, বোরন, ক্যালসিয়াম, বিভিন্ন এনজাইম ও আরো নানা ধরনের খনিজ পদার্থ বিদ্যমান।

মৌরি কাঁচা খেলে এই খনিজ পদার্থ উপাদানগুলোকে আমাদের শরীর খুব সহজেই শোষণ করে নেয়। অপরদিকে কাঁচা মৌরির কিছু অপকারিতা রয়েছে।

যারা একটু মেজাজি টাইপের তাদের মৌরি খাওয়া উচিত নয়। কারণ মৌরি আমাদের শরীরকে উত্তেজিত রাখতে সক্ষম। তাই বেশি মৌরি খেলে অনেকেই সামান্য কারণেই মেজাজ হারিয়ে বসতে পারেন।

মৌরির উপকারিতা

ভাজা মৌরির উপকারিতা

আমরা অনেকেই কৃমি রোগে দ্বারা আক্রান্ত হই। কৃমি রোগের আক্রান্ত হলে আমরা অনেক সময় অপুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারি। এমনকি বেশি করে খাবার খেলেও আমাদের শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি উপাদান পায় পারে না।

তাই শরীর থেকে কৃমি অপারেশন অপসারণ করা অনেকটাই বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। ভাজা মৌরি কিন্তু কৃমিনাশক হিসেবে দারুন কাজ করে। অল্প একটু ভাজা মৌরি প্রতিদিন দুবার করে খেলে কৃমি থেকে রেহাই পেতে পারবেন। আর মৌরির উপকারিতা পাচ্ছেন এখানেই।

এছাড়া বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করে জানতে পেরেছেন যে প্রতিদিন সকালে ভাজা মৌরি চিবাতে থাকলে ধূমপান করার ইচ্ছা একেবারেই কমে যায়। তাই যারা ধূমপায়ী এবং ধূমপান ত্যাগ করার কথা ভাবছেন তাদেরকে তাদেরকে ভাজা মৌরি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

মৌরির চা

চায়ের সাথে সামান্য একটু মৌরি যোগ করলে একটি উপদেয় পানীয় হয়ে যায়। যা শুধু স্বাদে নয়, একই সাথে আমাদের শরীরের জন্য স্বাস্থ্যকর। চা এবং মৌরি উভয়ে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

পাশাপাশি চায়ে রয়েছে ভিটামিন সি। যেটিও আবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান সহায়ক। অর্থাৎ মৌরি চা পান করলে আমাদের শরীর একটি বাড়তি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে পারে।

এছাড়া যারা ওজন কমাতে ইচ্ছুক তারাও নিয়মিত চায়ের সাথে মৌরির যোগ করে খেতে পারেন। অনেক সময় ওজন কমানোর জন্য আমরা গ্রিন টি খেয়ে থাকি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানসম্মত গ্রিন টি বাজারে পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে গ্রিন টিয়ের বিকল্প হতে পারে মৌরির চা।

মৌরির উপকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন: সকালে খালি পেটে এক সপ্তাহ মৌরি খেলে কি হবে?

উত্তর: সারারাত পানিতে মৌরি ভিজিয়ে খেলে শরীরের মেদ কমাতে সহায়তা করে। মৌরিতে রয়েছে মেদ কমানোর কিছু উৎসেচক। যারা ওজন কমাতে চাইছেন এবং পেটকে সুস্থ রাখতে চান তারা প্রতিদিন সকালে খালি পেটে টানা এক সপ্তাহ মৌরি খেতে পারেন।

মাত্র ৭ দিন সকাল খালি পেটে মৌরি খেলে আপনার দৃষ্টিশক্তি উন্নত হবে। কেষ্টকাঠিন্য রোগ হতে খুব দ্রুতই মুক্তি পাবেন এবং সহজে ক্লান্তি বা অবসাদে আক্রান্ত হবেন না।

প্রশ্ন: মৌরি ভেজানো পানির গুণাগুণগুলো কি কি?

উত্তর: মৌরি একটি ভেষজ ওষুধ। মৌরিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, আয়োডিন সহ আরো অন্যান্য খনিজ উপাদান। যখন মৌরিকে পানিতে ভেজানো হয় তখন উক্ত খনিজ উপাদানগুলো পানির সাথে মিশে যায়।

মৌরি ভেজানো পানি খেলে পেট পরিষ্কার হয় মুখের সজীবতা আসে। ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হয়, যা হার গুলোকে সুস্থ রাখে। শরীরের বিভিন্ন যৌগিক ক্রিয়া সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রাখে।

আবার মৌরিতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা এক প্রকার জীবাণু প্রতিরোধী। তাই নিয়মিত মৌরি খেলে ক্ষতিকর জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করাও সম্ভব।

প্রশ্ন: মৌরির শরবত কেন খাওয়া উচিত?

উত্তর: মৌরির শরবত আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত। এই শরবত খেলে খুব দ্রুতই আমরা সজীবতা অনুভব করি এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি মৌরির সকল ভেষজ গুণাবলীও আমরা ভোগ করতে পারছি।

মৌরির শরবত খেলে শরীরে রোগ জীবাণু প্রতিহত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ত্বক আরো মসৃণ হয়ে যায়। মৌরিতে উপস্থিত খনিজ উপাদানগুলো মানব শরীরে রক্তকে পরিশোধিত করে এবং ব্ল্যাড ক্যান্সার থেকে পরিত্রাণ করে।

এছাড়া যারা স্থূলতায় ভুগছেন বা শরীরের ওজন কমাতে চান তাদের শরীরের ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় মেদ অপ্রসারণ অপসারণ করতে মৌরির শরবতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

প্রশ্ন: ক্যান্সার রোধে মৌরি কি ভূমিকা পালন করে?

উত্তর: মৌরি নিয়ে খাদ্য বিজ্ঞানীরা নানারকম গবেষণা চালিয়েছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে নিয়মিত মৌরি খেলে ক্যান্সার থেকে বাঁচা সম্ভব। ক্যান্সার রোধে৷ মৌরির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে ব্ল্যাড ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার প্রতিহত করতে হলে আমাদের নিয়মিত মৌরির শরবত বা পানি পান করা উচিত।

প্রশ্ন: দুধে কেন মৌরি মেশানো উচিত?

উত্তর: দুধ একটি সুষম খাদ্য। দুধের মধ্যে প্রধান ছয়টি খাদ্য উপাদানের মধ্যে প্রত্যেকটি উপাদানই বিদ্যমান। এই পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবারটির সাথে যদি মৌরি মেশানো হয় তবে সেটি আরো পুষ্টি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে দুধ ও মৌরি মেশানোর দুধ খেলে যৌন শক্তি বৃদ্ধি পায় বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন। নারী ও পুরুষ উভয়কেই মৌরির মেশানো দুধ খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। মৌরির উপকারিতা সর্বোচ্চ পেতে হলে দুধ সহযোগে খাওয়া উত্তম।

এই তো জানলেন মৌরির উপকারিতা সম্পর্কে। আরো জানুন–

0

Farhan Mahin

Author: Farhan Mahin

ফারহান মাহিন পড়াশোনা করছেন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

Related Posts

রসুনের অপকারিতা

রসুনের ৭ টি অপকারিতা

রসুন একটি ভেষজ যা বহু শতাব্দী ধরে বহু রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি তার শক্তিশালী গন্ধ এবং স্বাস্থ্যগত গুরুত্বের জন্য
কিশমিশ খাওয়ার উপকারিতা

কিশমিশ খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

আমাদের রান্নাঘরে অতি মিষ্টি জাতীয় একটি খাবার হচ্ছে কিশমিশ। মিষ্টি জাতীয় খাবারে কিশমিশ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আপনি কি জানেন কিশমিশ
চিনির উপকারিতা

চিনির উপকারিতা ও অপকারিতা

ভোজন রসিক বাঙ্গালীর কাছে মিষ্টি জাতীয় খাবার অত্যন্ত প্রিয়। সন্দেশ, দই, রসমালাই, বিভিন্ন কোল্ড ড্রিংক, পায়েস ইত্যাদি পেলে বাঙালিকে আর
বেলের উপকারিতা

বেলের উপকারিতা ও অপকারিতা

বেল একটি খুবই সাধারণ ফল। শুধু গ্রামেই নয়, শহরেও তেল সমানভাবে জনপ্রিয়। বেল সাধারণত আমরা শরবত বানিয়ে খেয়ে থাকি। গ্রীষ্মকালে

Leave a Reply