#গল্প
মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে
আফছানা খানম অথৈ
দশ বছর বয়সী আল আমিন মাদরাসায় হিফজ পড়ত। ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানানোর স্বপ্ন ছিল তার মায়ের।নিজে অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েও ছেলের পড়াশোনায় কোনো কমতি রাখেননি। তাঁর একটাই স্বপ্ন—একদিন তাঁর ছেলে কোরআনের হাফেজ হবে, মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে, মানুষের সেবা করবে, ইসলামের আলো ছড়িয়ে মানুষকে সত্য ও সুন্দর পথে আহ্বান করবে। আর মায়ের জন্য দুহাত তুলে দোয়া করবে।মায়ের সেই স্বপ্নের মাঝেই একদিন হঠাৎ একটি ফোন এল।ওপাশ থেকে কাঁপা কণ্ঠে আল আমিন বলল,
—মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাকে নিয়ে যাও।
মায়ের বুক কেঁপে উঠল।
—কী হয়েছে বাবা? কোথায় কষ্ট হচ্ছে?
—মা, আমাকে নিয়ে যাও। তারপর তোমাকে সব বলব।
—তুই কাঁদছিস কেন বাবা? হুজুরকে বলেছিস?
—মা, তুমি শুধু আমাকে নিয়ে যাও।
এরপরই ফোন কেটে গেল।মা কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারলেন না। বারবার মনে হতে লাগল, তাঁর ছেলের নিশ্চয়ই বড় কোনো বিপদ হয়েছে।সারারাত তিনি ঘুমাতে পারলেন না। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
“হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে তুমি হেফাজত করো। আমার সন্তানের কোনো অমঙ্গল যেন না হয়।”
সকাল হতেই তিনি ছুটে গেলেন মাদরাসায়।গিয়ে দেখলেন, আল আমিন বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। প্রচণ্ড ব্যথায় এপাশ-ওপাশ করছে। মুখ ফ্যাকাশে, চোখেমুখে আতঙ্ক।মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
—বাবা, তোর কী হয়েছে? আমাকে বল। এমন কষ্ট পাচ্ছিস কেন?
আল আমিন কাঁদতে কাঁদতে বলল—
—মা, আমার খুব ব্যথা করছে।
—কোথায় ব্যথা করছে বাবা?
আল আমিন মায়ের দিকে তাকাল। তার চারপাশে কয়েকজন হুজুর দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিশুটির চোখে তখন স্পষ্ট ভয়।সে আর কিছু বলল না।মায়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।তিনি ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন—
—ভয় পাস না বাবা। আমি তোর মা। তুই আমাকে সব বলতে পারিস। সত্যি কথা বললে তোকে কেউ শাস্তি দেবে না।
কিন্তু আল আমিন তখনও চুপ।মা আর দেরি করলেন না। ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গেলেন।পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানালেন, আল আমিন দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।কথাটা শুনে মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
—ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলের এই সর্বনাশ কে করেছে?
—যে কেউ একজন করেছে।
—এখন কী হবে?
—ভয় পাবেন না।আমরা চিকিৎসা চালিয়ে যাব,,,তবে আপনার সন্তানকে চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও দিতে হবে। আর বিষয়টি আইনগতভাবে জানানো জরুরি।
মা ছেলের কাছে ফিরে এলেন। চোখের পানি মুছে ছেলের হাত ধরে বললেন—
—বাবা, এবার আর ভয় পাবি না। তুই আমাকে সব বল। যা হয়েছে, সব বল। আমি তোর পাশে আছি।
আল আমিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
—মা, একজন হুজুর আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করেছে।
মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
—কে বাবা?
আল আমিন কাঁপা কণ্ঠে বলল—
–কাদের হুজুর।আমি বাধা দিয়েছিলাম, মা। কিন্তু সে আমাকে ভয় দেখিয়েছে। বলেছে, কাউকে বললে আমাকে মেরে ফেলবে। তাই আমি এতদিন কাউকে কিছু বলতে পারিনি।
মা ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন—
—তুই কোনো অপরাধ করিসনি বাবা। তোর কোনো দোষ নেই। যে মানুষ তোকে ভয় দেখিয়ে এই কাজ করেছে, অপরাধ তার। তুই ভয় পাবি না। এবার তোর মা তোর পাশে আছে।
এরপর আল আমিনের মা অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল।তদন্তে আরও কিছু শিশুর কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করল। যারা এতদিন ভয় ও লজ্জায় মুখ খুলতে পারেনি, তাদের কয়েকজনও সাহস করে পরিবারের কাছে নিজেদের কষ্টের কথা জানাতে শুরু করল।একজন অভিভাবক কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—আমরা তো ভেবেছিলাম, সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা নিতে দিয়ে নিরাপদ হাতে তুলে দিয়েছি। কখনো ভাবিনি, সেই জায়গাতেই তার নিরাপত্তা নষ্ট হতে পারে।
আরেকজন বললেন—
—শিশুকে স্কুলে, মাদরাসায় কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়। তার সঙ্গে কী হচ্ছে, সে নিরাপদ আছে কি না—সেটাও আমাদের জানতে হবে।
আল আমিনের মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—আমার ছেলের স্বপ্ন আমি শেষ হতে দেব না। সে আবার পড়বে, মানুষ হবে। কিন্তু আর কোনো মায়ের সন্তান যেন এমন কষ্ট নিয়ে ফোন করে না বলে—‘মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমাকে নিয়ে যাও।’
সত্যিই, একটি শিশুর মুখের এই কথাগুলো অবহেলা করার মতো নয়।শিশু ছেলে হোক কিংবা মেয়ে—যে কোনো শিশুই নির্যাতনের শিকার হতে পারে। তাই শুধু পরিচয়, পোশাক, পদবি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন এলে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দেখে ভয় পেলে, অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে গেলে কিংবা বারবার বললে—“আমি বাড়ি যেতে চাই”—তাকে জিজ্ঞেস করুন।ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া শিশুকে সাহস দিন।তার কথা বিশ্বাস করুন।তার পাশে দাঁড়ান।কারণ অনেক সময় একটি শিশুর মুখে উচ্চারিত ছোট্ট একটি বাক্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ কোনো নির্যাতনের গল্প।
আর মনে রাখবেন—শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো শিক্ষা নয়,শিশুর কান্নার চেয়ে বড় কোনো সামাজিক সম্মান নয়।একজন আল আমিনের কান্না যেন আর কোনো মায়ের ঘুম কেড়ে না নেয়।শিশুকে নিরাপদ রাখুন।
নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলুন।অপরাধী যেই হোক, আইনের আওতায় আনুন।
ঃসমাপ্তঃ
