ইহুদি ধর্ম
পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাস

ইহুদি ধর্মের ইতিহাস, বিশ্বাস ও উৎপত্তি

ইংরেজী ‘Judaism’ শব্দটি হিব্রু শব্দ ‘ইয়েহুদাহ’ থেকে উদ্ভুত  যেটাকে বাংলায় ইহুদি ধর্ম বলা হয়। এটি একটি আব্রাহামিক একেশ্বরবাদী জাতিগত ধর্মবিশ্বাসের নাম। ইহুদি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, বিশ্বাস, দর্শন, ইতিহাস এগুলো এই ধর্মে প্রতিফলিত হয়।

অনুসারী সংখ্যার ভিত্তিতে এটি পৃথিবীর দশম বৃহত্তম ধর্ম। হিব্রু বাইবেলে তোরাহ, তানাখের একটি বড় অংশের নাম যা ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ। ইহুদিদের উপাসনালয়ের নাম সিনাগগ।

এই লেখাটিতে যা যা থাকছে-

ধার্মিক ইহুদিরা এই ধর্মকে ঈশ্বর এবং ইসরাইলের সন্তানদের মধ্যে চুক্তির প্রকাশ বলে মনে করে। ইসরাইল পৃথিবীর একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র। কেউ কেউ এই রাষ্ট্রটিকে Zionist(কট্টর ইহুদিবাদি) রাষ্ট্র বলে মনে করেন, এটি সত্য যে এই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র আছে।

ইহুদিরা কোন ধর্মের অনুসারী ?

ইহুদিদের ধর্মকে ইংরেজীতে Judaism এবং বাংলায় ইহুদি ধর্ম বলা হয়।

মুসলিমরা যেমন ৭ টি বিষয়ে বিশ্বাস করে(ঈমানে মুফাসসাল) ইহুদিরাও তেমন রামবামের ১৩ টি নীতিতে বিশ্বাস করে।


  1. সৃষ্টিকর্তা আছেন
  2. সৃষ্টিকর্তা এক এবং অনন্য
  3. সৃষ্টিকর্তা নিরাকার
  4. সৃষ্টিকর্তা স্বর্গীয়
  5. উপাসনা শুধু তারই(সৃষ্টিকর্তার) উদ্দেশ্যে করা উচিত, অন্য কারো নয়
  6. নবীদের কথাগুলো সত্য
  7. মোজেসের(মূসার) নবুয়ত সত্য, তিনিই নবীদের মধ্যে সেরা
  8. তোরাহর লিখিত এবং মৌখিক রূপ মুসাকে দেয়া হয়েছিল
  9. তোরাহর অন্য কোন ভার্সন নেই
  10.  সৃষ্টিকর্তা মানুষের চিন্তা এবং কাজ সম্পর্কে জ্ঞাত
  11. সৃষ্টিকর্তা ভালো লোকদের পুরষ্কৃত করবেন এবং মন্দ লোকদের শাস্তি দেবেন
  12. মেসিয়াহ আসবে
  13. মৃতরা পুনরুত্থিত হবে

মসীহ শব্দের অর্থ কি?

মসীহ বা,  মেসিয়াহ বলতে ত্রানকর্তা বুঝায় না, এটি বুঝায় একজন রাজাকে যার বৈশিষ্ট্য হবে আগেকার দিনের ইহুদি রাজাদের মত। এটার মাধ্যমে ডেভিডের(দাউদ) মত কোন রাজাকে বুঝায়, খ্রিস্টানরা ‘মোশিয়াহ'(আলাদা) শব্দটাকে ব্যাখ্যা করে যিশুকে মেসিয়াহ বলতে চায় যা, হিব্রু ইহুদিরা অস্বীকার করে।
মুসলিমরা মেসিয়াহ বলতে মুহাম্মদকে বুঝাতে চায়- কারণ সে রাজার মত ছিল, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সংস্কার করেছিল, উপাসনালয়গুলো পুননির্মাণ করেছিল, কুরআনের নিয়মকে রাষ্ট্রের নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু, ইহুদিরা এটাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে কারণ, ডেভিডের সন্তান সে ছিল না, ইসরাইলে এমন কোন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেনি যা সারা বিশ্বের কেন্দ্র ছিল।

কিছু প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্নঃ ইহুদি ধর্মের ইতিহাস কি?

উত্তরঃ  শব্দটিও জাতিগত। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে আব্রাহামকে হিব্রু বলে অভিহিত করা হয়েছে। আব্রাহামের পূর্ব পুরুষের নাম ছিল ‘এবর’ সেখান থেকে শব্দটি এসেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইসরাইল ছিল ইয়াকুবের(জ্যাকব) আরেক নাম।

প্রশ্নঃ ইহুদি ধর্মের উৎসব কোনগুলো?

উত্তরঃ ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের অনেকগুলো ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। সবচেয়ে বড় উৎসবগুলো একে একে আপনাদের সামনে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করব-
পাসওভার: এটি আটদিনব্যাপী একটি অনুষ্ঠান। ইসরাইলের সন্তানদের স্বাধীনিতা দিবস। এই দিনে মূসা ইসরাইলের সন্তানদের মিসরীয় দাসত্বের হাত থেকে মুক্ত করেছিল।


রোস হাসানাহ বা, ইহুদি নববর্ষ: এই দিনে পৃথিবীর সৃৃষ্টিকে স্মরণ করা হয়। ‘লিসানাহ তোভাহ তিকাতেভ’ এর অর্থ শুভ নববর্ষ।
ইয়ম কিপ্পুর: অনুতাপের দিন। এই দিনে প্রার্থনা, ২৫ ঘন্টা না খেয়ে থাকা এইসব আচার অনুষ্ঠান পালন করে, সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চায়।
সুক্কোথ: সেই দিনগুলোর কথা তারা স্মরণ করে যখন তাদের ভূমিতে ফিরে আসার আগে মরুভূমিতে তাবু, গাছ- লতাপাতার ঘর বানিয়ে ছিল।
হানুক্কাহ: খ্রিস্টের জন্মের দুইশত বছর আগের উৎসব। ধর্মীয় হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে পবিত্র ভূমিতে তাদের জয়কে উদযাপন করে। এটিকে বলা হয় আলোর উৎসব।
তিশাবায়াব: এটি এমন একটি দিন যে দিনে ইহুদিদের অনেকগুলো দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে।
তু বেশাভাত: এটি চারটি নববর্ষের একটি।
ইয়ম হাশোয়াহ: ইহুদি গণহত্যার কথা স্মরণ করার জন্য একটি দিন ওরা রেখেছে।

প্রশ্নঃ ইহুদি ধর্মের প্রবর্তক কে?

উত্তরঃ এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আব্রাহাম পরিচিত। সৃষ্টিকর্তা প্রথমে তাঁর কাছে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বংশ ছিল বেছে নেয়া বংশ যাদেরকে স্রষ্টা মহান জাতি বানিয়েছিলেন। এছাড়া মোজেসকেও অনেকে এই ধর্মের প্রবর্তক বলে মনে করেন।

টেন কমান্ডমেন্টস বা, মুসার দশটি আজ্ঞা

মোজেস ইহুদি জাতিকে দীর্ঘদিনের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং টেন কমান্ডমেন্ট দিয়েছিলেন। মুসার দশটি আজ্ঞা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার নিদেশ যা মুসা এবং তার জাতির কাছে দেয়া হয়েছিলো।

টেন কমান্ডমেন্ট বা, মূসার দশটি আজ্ঞা
আমস্টারডামের একটি সিনাগগে পাওয়া হিব্রু ভাষায় টেন কমান্ডমেন্ট
ইহুদিরা ঈশ্বরের বেছে নেয়া জাতি তাই তাদের দায়িত্বও বেশী, মূসার দশটি আজ্ঞা(টেন কমান্ডমেন্ট) তাদের মেনে চলতে হয়, অন্যদের জন্য রয়েছে নূহের(নোয়াহ) ৭ টি নিয়ম। মুসলিমদের হালাল খাবারের মত ইহুদিদের খাবারের নিয়ম রয়েছে, সেটাকে বলা হয় কোশের খাবার, দিনে তিনবার এরা উপাসনা করে, শনিবার বিশ্রামের দিন হিসেবে পালন করে।

ইহুদি ধর্ম আর ইসলাম ধর্মের অনেক সাদৃশ্য আছে, আবার অনেক পার্থক্যও আছে। এখানে পার্থক্যগুলো নিয়ে লিখবো। ইহুদি শব্দটি এসেছে ‘ইয়াহুদা’ থেকে। ইয়াকুবের পুত্র এবং ইউসুফের ভাই ছিলেন ইয়াহুদা বা, যিহুদা। আব্রাহাম বা, ইব্রাহিম এই ধর্মের প্রবর্তক বলে ইহুদিদের দাবি। তবে ধর্মতাত্ত্বিকেরা মূসা বা, মোজেসকে এই ধর্মের প্রবর্তক বলে মনে করেন।

ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের পার্থক্য কি কি
মুসলিমদের মতো ইহুদিরাও একেশ্বরবাদী। ওরাও নামাজ পড়ার মতো উপাসনা করে, হালাল খাবারের মতো কোশের খাবার খায়। এরকম আরো অনেক মিল আছে।

ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের পার্থক্য গুলো কি কি?

এই দুটি ধর্মই আব্রাহামিক। মূসা বা, মোজেস যিনি ইহুদি জাতিকে ফারাও এর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন, তিনি এই দুটি ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক হিসেবে বিবেচিত হোন। উপাসনা এবং খাবারেও রয়েছে অনেক মিল। ইসলাম এবং ইহুদি দুটি ধর্মের অনুসারীরাই শূকরের মাংস নিষিদ্ধ মনে করেন, ইহুদিদের উপাসনা পদ্ধতিও মুসলিমদের নামাজের মতো।

ইহুদি ধর্ম
এই ধর্মের প্রচারক মুহাম্মদ
এই ধর্মের প্রচারক মূসা বা, মোজেস
এটি মূলত আরব উপদ্বীপে বেড়ে উঠেছে এটি ইসরাইল, ফিলিস্তিন এবং জর্ডানকেন্দ্রীক
সৃষ্টিকর্তাকে আল্লাহ নামে ডাকে সৃষ্টিকর্তাকে ইয়াহওয়েহ নামে ডাকে
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তোরাহ
দ্বিতীয় উৎস হাদিস দ্বিতীয় উৎস তালমুদ
ধার্মিক মুসলিমরা শরীয়াহ আইন মেনে চলে ধার্মিক ইহুদিরা হালাকাহ আইন মেনে চলে
ইহুদিদের কিতাবি বলা হয়। ইসলাম সত্য ধর্ম ইসলাম ধর্মকে ইহুদি ধর্মের অপভ্রংস হিসেবে দেখা হয়

 

(তথ্যগুলো researchgate.net এ স্কট ভিটকোভিচ এর লেখা থেকে সংগ্রহ করা)


এর বাইরে ইহুদি কোশের খাবারের ভেতর উটের মাংস নেই, যা মুসলিমরা হালাল খাবার হিসেবে খায়। যিশুকে মুসলিমরা মেসিয়াহ বলে মানে, ইহুদিরা তাকে সাধারণ একজন ইহুদি রাবাই হিসেবে দেখে। জন্মের অলৌকিকতা মানে না।

তথ্যসূত্রঃ
  1. Judaism 101- Jewish Encyclopedia
  2. Judaism- Wikipedia

(Visited 19 times, 1 visits today)
0
likeheartlaughterwowsadangry
0

Author

admin@lekhok.me
বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করছি।

Comments

Leave a Reply