ধর্ম কাকে বলে, Religion ই কি ধর্ম?

ধর্ম কাকে বলে?

ধর্ম কাকে বলে বা, ধর্ম কি এই প্রশ্নে উত্তর দিতে হলে এই শব্দটির উৎস জানতে হবে।  ধর্ম শব্দের ইংরেজী প্রতিশব্দ ‘Religion’. এখন বাংলাতেও ধর্ম বলতে সাধারণত ‘Religion’ বুঝায়। তবে বাংলায় এর অর্থটা কিছুটা আলাদা।

ধর্ম শব্দটি সংস্কৃত √ধৃ থেকে উৎপন্ন। সেক্ষেত্রে কোন কিছু ধারণ করা বুঝাতেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আগুনের ধর্ম পোড়ানো, গাছের ধর্ম কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করা। এরকম বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন রকম ধর্ম রয়েছে।

ইংরেজীতে শব্দটি দিয়ে আধ্যাত্মিক কোন শক্তি, পরম সত্ত্বা বা, স্বর্গীয় কোন কিছুর সাথে মানুষের সম্পর্ক বুঝায়। মানুষের জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য বা, মৃত্যু পরবর্তী ভাবনাগুলো Religion এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় আইন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়।

পৃথিবীর প্রধান ধর্মবিশ্বাসগুলো

ধর্মতাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন ধর্মগুলোকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন-

  1. আব্রাহামিক ধর্ম(ইসলাম, খ্রিস্টীয়, ইহুদি, বাহাই ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত)
  2. ভারতীয় ধর্ম(ভারতীয় এর মাঝে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ইত্যাদি পড়ে)
  3. চীনের এবং জাপানের ধর্ম(তাও, শিন্টো, কনফুসীয় ইত্যাদি)
  4. আফ্রিকান ধর্ম ও অন্যান্য(আফ্রিকান বিভিন্ন গোষ্ঠী)

এই চারটি ভাগের বাইরেও অসংখ্য বিশ্বাস রয়েছে। ইরানে জরুথ্রুষ্টীয় ধর্ম, তাছাড়া প্রতিটি মহাদেশেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রয়েছে- সেগুলোকে ৪ নম্বরে বিবেচনা করা যায়

অঞ্চলভিত্তিক ধর্মবিশ্বাসঃ

প্রতিটি অঞ্চলের ধর্মবিশ্বাসের মাঝে কিছু মিল রয়েছে- যেমনঃ আব্রাহামিক ধর্মগুলো একেশ্বরবাদ প্রচার করে এবং ভালো, মন্দ, শাস্তি, পুরস্কার, পরকাল, পুনরুত্থান এই ধারণাগুলো রয়েছে।

ভারতীয় ধর্মগুলো ঈশ্বরের সর্বব্যাপী অবস্থানের কথা বলে। এই ধর্মগুলোতে পুনর্জন্ম, ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপের প্রকাশ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আব্রাহামিক বিশ্বাসের মতো একেশ্বরবাদিতা এবং চৈনিক ধর্মের মতো আঞ্চলিক আচারনির্ভরতা খুজে পাওয়া যায়।

দূর প্রাচ্যের ধর্মগুলোতে সৃষ্টিকর্তার চেয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক ধ্যান ধারণার প্রকাশ বেশী দেখা যায়। এগুলোকে অনেকে ধর্মের বদলে দর্শন নামে ডাকতে পছন্দ করেন।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচরণ এবং চিন্তা চেতনার প্রভাব এদের ধর্মীয় রীতিপালনে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। জাতিসত্ত্বা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস দুটি বিষয়ই তাদের বেশীরভাগের কাছে সমার্থক।

ধর্মগুলো সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব ই মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়ানোর প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে বলে আমি মনে করি। নিজের ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি অন্যদের ধর্মীয় চেতনা এবং দর্শন সম্পর্কে জানলে হয়তো এই ঘৃণা এবং হানাহানি থাকতো না।

 

আব্রাহামিক ধর্ম

আব্রাহামিক ধর্ম
আব্রাহামিক ধর্ম শব্দটি শুনলেই প্রথমেই যেটি মাথায় আসে সেটি হচ্ছে এটি আব্রাহামের সাথে সম্পর্কিত কিছু। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন- বাইবেল এবং কুরআনের একটি চরিত্র আব্রাহাম বা, ইব্রাহিম। প্রধান আব্রাহামিক ধর্মগুলো হচ্ছে- খ্রিস্ট , ইসলাম এবং ইহুদি। এছাড়া বাহাই, রাস্তাফারি বা, মর্মনিজম এগুলোকে এই প্রধান ধর্মগুলোর শাখা হিসেবেও ধরে নেয়া যায়।

আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মৌলিক বৈশিষ্ট্য

কিছু বিষয় এই ধর্মগুলোর মাঝে সাধারণ বৈধিষ্ট্য হিসেবে দেখা দেয়। চলুন এরকম কিছু বিষয় জেনে নেই-

  1. সৃষ্টিকর্তা একজন, শুধুমাত্র তারই উপাসনা করা উচিত। খ্রিস্টানদের ট্রিনিটিকে অনেকে বহুত্ববাদ বললেও সেক্ষেত্রে একাধিক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব বা, উপাসনা করা হয় না।
  2. অনেক নবীই এই ধর্মগুলোতে কমন
  3. সবাই নবী আব্রাহামের সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে(ইয়াহওয়েহ, যিহোভা বা, আল্লাহ)
প্রধান প্রধান আব্রাহামিক ধর্মগুলো আমরা আলোচনা করব-

নিচের চিত্রে কিছু ছোট(অনুসারী বিবেচনায়) আব্রাহামিক ধর্ম, অনুসারী সংখ্যা, প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতীক দেখে নিন-

ছোট ছোট আব্রাহামিক ধর্ম সমূহ

ছবির কৃতিত্বঃ Islam90,ছবিটি Creative Commons Attribution-Share Alike 3.0 Unported লাইসেন্সের আওতাভুক্ত। 

নূহ বা, নোয়ার মহাপ্লাবনের পরে আব্রাহামকেই অনেকে মনে করেন প্রথম ব্যক্তি যিনি মূর্তিপুজাকে অস্বীকার(কিংবা, বিরোধিতা) করেছিলেন। খ্রিস্টানরা মনে করে তিনিই সর্বপ্রথম ট্রিনিটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তিনজন ফেরেশতারূপে তার কাছে ত্রিত্ববাদের শিক্ষাই এসেছিলো। মুসলিমরা তাকে জাতির পিতা বলেন, বাইবেলেও তাকে বহু জাতির পিতা বলা হয়। তিনি ছিলেন নূহের পরে প্রথম মুসলিম(মুসলিমদের মতে)।

মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস এই ধর্মের অংশ। এটা মনে করা হয় যে এই জীবনের পরে নশ্বর শরীর না থাকলে আত্মা বেঁচে থাকবে, পুনরুত্থিত জীবনে কি ঘটবে সেটা নিয়ে বিভিন্ন ধর্মে মতবিরোধ আছে

 

ভারতীয় ধর্ম

ভারতীয় ধর্ম
ভারতীয় ধর্ম বলতে ভারতে যেসব ধর্মের উৎপত্তি সেসব ধর্মকে বুঝায়। অনেকে মনে করেন সিন্ধু নদের আশেপাশের সবাই হিন্দু, তাই ভারতীয় ধর্ম বলতে হিন্দু ধর্মকে বুঝায়। মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন সবাই হিন্দু। ভৌগলিক পরিচয় অর্থে হিন্দু শব্দটি ব্যবহার করলে সেটা বলাই যায়। তবে সাধারণত এই উপমহাদেশে উৎপত্তি হওয়া সব ধর্মবিশ্বাসগুলোকে ধর্মতাত্ত্বিকেরা ভারতীয় ধর্ম বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অসংখ্য ধর্মবিশ্বাস এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এবং এখনো আছে। সেগুলোকে কেউ আলাদাভাবে দেখেন কেউ আবার প্রধান বিশ্বাসগুলোর মাঝে অন্তর্ভূক্ত মনে করেন। প্রধান(অনুসারি সংখ্যার ভিত্তিতে) বিশ্বাসগুলো-
এখন ‘ভারত’ নামে যে দেশটি আছে, সেই দেশের ভিত্তিতে এই শ্রেণীবিভাগ করা হয় নি। অঞ্চলভিত্তিক এই শ্রেণীবিভাগে তাই ইসলাম, ইহুদি, পারসিক এগুলোর কোনটাই নেই। মতুয়া, ব্রাহ্ম এগুলোকেও আলাদাভাবে এই শ্রেণীভুক্ত করা হয় নি।

চীনের এবং জাপানের ধর্ম

চীনের এবং জাপানের ধর্ম
দূর প্রাচ্যে যেসব ধর্মের উৎপত্তি সেগুলোকে বলা হয় দূর প্রাচ্যের ধর্ম। যেমনঃ তাও , শিন্টো , কনফুসীয়, পূর্ব এশিয় বৌদ্ধ ইত্যাদি। পূর্ব এশিয়াতে এইসব ধর্মের উৎপত্তি। এগুলো সাধারণত বহুঈশ্বরবাদী বা, নীরিশ্বরবাদি ধর্ম।

চীন, জাপান, কোরিয়া এইসব দেশে এই ধরণের ধর্মগুলো জনপ্রিয়। এগুলোকে অনেকে ধর্ম না বলে দর্শন বলেন

এই অঞ্চলের বিখ্যাত কিছু বিশ্বাস নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করবো-
প্রচলিত আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মত এইসব ধর্মে স্বর্গ-নরক, ভালো-মন্দ, ঈশ্বরের ধারণা এক নয়। এটাকে আঞ্চলিক সংস্কৃতি বললেও অত্যুক্তি হয় না। আবার, এর প্রভাবের কারণে Religion না বলেও উপায় নেই। পূর্ব এশিয় দর্শন পৃথিবীর বাকি অংশগুলোর দর্শনের তুলনায় অনেকটাই আলাদা।

আফ্রিকান ধর্ম ও অন্যান্য

আফ্রিকান ও অন্যান্য ধর্ম

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে যাদের রয়েছে আলাদা ধর্মবিশ্বাস। মূলধারার ধর্মগুলোর ভেতরে এগুলোকে অনেক সময় ফেলা যায় না। অন্যন্য অঞ্চলের মত আফ্রিকার বিভিন্ন জাতির মধ্যে এরকম আলাদা আলাদা বিশ্বাস প্রচলিত আছে এবং আগেও ছিল।

আফ্রিকান নৃ-গোষ্ঠীর ধর্মের বৈশিষ্ট্য

কিছু বৈশিষ্ট্য না বললে পুরো ব্যাপারটা আপনাদের কাছে স্পষ্ট হবে না। এমন কিছু বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-

  • পূর্বপুরুষের আত্মার মাধ্যমে স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার রীতি
  • পশু, পাখি, শাকসবজি এগুলো পূর্বপুরুষকে উৎসর্গ করা
  • অনেকে মনে করেন বাস্তব জগত চক্রাকারে আবর্তিত হয়। নতুন শিশুর জন্ম এবং বৃদ্ধদের মৃত্যুর মাঝে যোগসূত্র আছে
  • চাঁদ, তারা, গ্রহ, নক্ষত্র এগুলোকে পবিত্র কোন শক্তি মনে করা

এরকম আরো বিভিন্ন রকম বিশ্বাস বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আলাদা আলাদাভাবে রয়েছে, আবার এগুলোর মাঝে অনেক মিলও আছে।মধ্য আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, উত্তর আফ্রিকা সব জায়গার বিশ্বাসের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

আফ্রিকার কথা যখন হচ্ছে, তখন মিসরকে অগ্রাহ্য করি কিভাবে। মিসরীয় ফারাওরা এক বিশেষ ধরণের বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজারা অনেকেই নিজেদের স্রষ্টার অংশ মনে করতেন

এখানে সবগুলো ধর্ম এবং আলাদাভাবে এইসব ধর্ম বলতে কি বুঝায় সেটি ব্যাখ্যা করি নাই, তবে আপনাদের অজানা অনেক তথ্য এই লেখাটি থেকে হয়তো পেতে পারেন।

 

তথ্যসূত্রঃ
  1. https://blog.bdnews24.com/zakirhossain281075/180899 (bdnews24 ব্লগের একটি লেখা)
  2. https://www.newworldencyclopedia.org/entry/Religion (একটি এনসাইক্লোপিডিয়ার তথ্য)
  3. http://www.adherents.com/Religions_By_Adherents.html (বিশ্বাসীদের সংখ্যার ভিত্তিতে খুব সুন্দরভাবে লিস্ট করা আছে)
  4. https://curlie.org/Society/Religion_and_Spirituality (বিভিন্ন নাম আর তথ্য এখানে পাওয়া যাবে)

(Visited 25 times, 1 visits today)
1
likeheartlaughterwowsadangry
0

Related Posts

যিশু খ্রিস্ট

যিশু খ্রিস্ট

যিশুকে বলা হয় নাজারাথের যিশু। খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীরা তাকে ঈশ্বরের পুত্ররূপী ঈশ্বর এবং মেসিয়াহ মনে করেন। তিনিই খ্রিস্ট ধর্মের কেন্দ্রীয়

নাস্তিকতাবাদ, অজ্ঞেয়বাদ এবং অন্যান্য মতবাদ

নাস্তিকতাবাদ বলতে আমরা এমন মতবাদকে বুঝি যেখানে ঈশ্বরের বা, কোন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না। এর বাইরে আরো কতগুলো

শিন্টো ধর্ম- জাপানের মানুষের ধর্মবিশ্বাস

শিন্টো ধর্ম বহুঈশ্বরবাদী একটি ধর্ম। শিন্টো শব্দের অর্থ দেবতার পথ। এই ধর্মে সৃষ্টিকর্তাকে বলা হয় কামি। অসংখ্য স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ(pdf ফাইল) ডাউনলোড করে নিন

মোট চারটি বেদের অর্থাৎ ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ এর ডাউনলোড লিংক আমরা দিয়ে দেবো। আপনারা এখান থেকে ডাউনলোড করে

Leave a Reply