আরজ আলী মাতুব্বরের লাইব্রেরী

আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত দার্শনিক

play icon Listen to this article
0
আরজ আলী মাতুব্বর বরিশালের একজন কৃষক এবং একজন মাতুব্বর ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করে একজন স্বশিক্ষিত দার্শনিক হয়ে ওঠেন। প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস এবং আচরণ নিয়ে তিনি অনেকগুলো প্রশ্ন করেছেন এবং কিছু বিষয়ে নিজের মত ব্যক্ত করেছেন। 

আরজ আলী মাতুব্বরের লাইব্রেরী

বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্যপদ লাভ করা এই ব্যক্তিটি তার অর্জিত সম্পদ দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি‘ নামে একটি পাঠাগার। তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সম্মাননা এবং হুমায়ুন কবির সাহিত্য পুরষ্কার লাভ করেছিলেন। 
বরিশাল লাইব্রেরীর বইগুলো যখন তার জ্ঞানের চাহিদা মেটাতে পারছিলো না তখন কলেজের একজন শিক্ষক কলেজের লাইব্রেরীর বইগুলো ধার নেয়ার ব্যবস্থা করে দেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা স্কুলের গণ্ডিতে আবদ্ধ হলেও স্বশিক্ষিত আরজ আলী মাতুব্বর একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। 
তার বিখ্যাত বই ‘সত্যের সন্ধানে’। এই বইয়ে ৬৮ টি(কমবেশী হতে পারে) প্রশ্ন উপস্থাপন করেন। যেমনঃ 
  • আমি কে?
  • আমি কি মুক্ত ? 
  • মন এবং আত্মা কি একই জিনিস? 
  • কিভাবে শরীরে আত্মা প্রবেশ করে এবং বের হয় ? 

নাস্তিক মাতুব্বর

ধারণা করা হয়, তার মায়ের মৃত্যুর পর গ্রামের লোকেরা জানাজা পড়াতে রাজী না হওয়াটাই প্রচলিত ধর্ম, নিয়ম, সংস্কারের প্রতি তাকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। তার মায়ের মৃত্যুর পর ছবি তোলা হয়েছিল, এই অপরাধে গ্রামের মোল্লা, মৌলভিরা জানাজা পড়ায় নি

জীবনের দীর্ঘ্য সময় তিনি শুধু পড়াশোনা করেই কাটিয়েছেন। আমাদের সমাজে পরিচিত আলেম- ওলামাদের কাছে গিয়েও অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছেন। তার গণ্ডির মাঝে থেকে ইসলাম ধর্মকে যেভাবে দেখা সম্ভব সেভাবেই দেখেছেন।

পজিটিভ দিক হচ্ছে, তিনি কারো কথায় অন্ধভাবে কিছু বিশ্বাস করেননি। সেই বিষয়ে জানার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। Hypocrisy বা, প্রবঞ্চনা বলতে যা বোঝায় তার লেখায় আমি তা পাইনি। অনেকেই বুঝতে পারেন না– আমাদের সময়ে যেমন চাইলেই কেউ শাবির আলি, ইয়াসির কাদির লেকচার শুনতে পারে, তখন সেটা সম্ভব ছিল না। নিঃসন্দেহে তিনি সত্যের সন্ধান করেছেন যা বাংলাদেশের মানুষেরা বেশীরভাগই করে না।

এই লোকটি জানার জন্য লোকের কাছে ছুটে বেড়িয়েছেন, একজন শিক্ষকের সহায়তায় কলেজের পাঠাগার থেকে বই সংগ্রহ করে পড়েছেন। নিজে একটি লাইব্রেরী তৈরি করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন একজন মানুষ স্বশিক্ষিত হয়ে বই লিখেছেন।

ধর্মকে আক্রমণ করেননি

একজন মুসলিম হয়েও আমি তাকে পছন্দ করি কারণ তিনি জানতে আগ্রহী ছিলেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহী ছিলেন। তার আশেপাশের তথাকথিত ধার্মিকেরা তার মতো সত্যের সন্ধান করেনি, এবং তার প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারেনি।

অন্য অনেক রকম প্রবঞ্চক নাস্তিকদের আমরা দেখতে পাই যারা, শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ করতেই ভালোবাসেন। তাদের পরিচয় ইসলামবিদ্বেষী দেয়া যেতে পারে, নাস্তিক নয়। বিদ্বেষ পোষণ করা যেকোন বিচারেই অপরাধ। একইসাথে, মত প্রকাশের অধিকার সবারই থাকা উচিত। সম্প্রতি আরিফ আজাদ তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে একটি বই লিখেছেন- ‘আরজ আলী সমীপে’ নামে। নিঃসন্দেহে এটি খুব ভালো একটি উদ্যোগ।

মাতুব্বরের বাণী

 আরজ আলী মাতুব্বরের একটি উক্তি-

কোন ব্যক্তি যদি একজন ক্ষুধার্তকে অন্নদান ও একজন পথিকের মাল লুন্ঠন করে ও অন্য কাউকে হত্যা করে অথবা একজন গৃহহীনকে গৃহদান করে এবং অপরের গৃহ করে অগ্নিদাহ, তবে তাহাকে ‘দয়াময় ‘বলা যায় না

আমরা এখানে আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে লিখছি কারণ তিনি ধর্ম নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলেছেন এবং সেগুলোর উত্তর খুঁজেছেন। এই ওয়েবসাইট ধর্ম সম্পর্কিত তথ্য দেয়, তাই তিনিও প্রাসঙ্গিক। এমন কোন কথা নেই যে তার সাথে একজন ধার্মিক হিসেবে আপনাকেও একমত হতে হবে। মাতুব্বর সাহেব সবকিছু সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য কিংবা, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সম্পর্কে জানতেন না। নির্দ্বিধায় বলতে পারি তিনি জ্ঞানী ছিলেন এবং সত্যের সন্ধান করেছেন। 
আরজ আলী মাতুব্বরের লেখা বই- ‘সত্যের সন্ধানে’ এবং ‘সৃষ্টিরহস্য’ তার জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। একজন মানুষের জীবনদর্শন এবং তার চিন্তাভাবনা জানার জন্য আপনাকে তার মতো হয়ে যেতে হবে না। তাই, একজন ধার্মিক হয়েও আপনি তার বই পড়তে পারেন।
আরো পড়ুন-
ছবির জন্য কৃতজ্ঞতাঃ greennewsbd

 

0

প্রবন্ধ লেখক

Author: প্রবন্ধ লেখক

বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করছি

Related Posts

Huzur Me scaled

একজন প্রফেসর মীর হাসান আলি (নিভৃতে ইসলাম এর সেবায় নিয়োজিত এবং মানুষ ও জাতি গড়ার একজন পথপ্রদর্শকের নাম)

একজন প্রফেসর মীর হাসান আলি (নিভৃতে ইসলাম এর সেবায় নিয়োজিত এবং মানুষ ও জাতি গড়ার একজন পথপ্রদর্শকের নাম) -------------------------------------------------- #
মহাভারত, পঞ্চপান্ডব, মহাকাব্য, ইতিহাস, যুদ্ধ, যোদ্ধা

মহাভারতের পঞ্চপান্ডব

মহাভারতের পঞ্চপান্ডব ছিলেন পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র- যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেব। মুনি দুর্বাসার দেয়া বর কাজে লাগিয়ে কুন্তি ও
দক্ষিণী বিদ্যাসাগর

কান্দুকুরি বীরসালিঙ্গম পানতুলু

বীরসালিঙ্গম পানতুলুকে বলা হয় দক্ষিণী বিদ্যাসাগর। কেন তাকে তেলেগু রেনেসাঁর জনক বলা হয় সেটা পরে বলছি। রায়বাহাদুর কান্দুকুরি বীরসালিঙ্গম পানতুলু
2020 Kenneth Kaunda

কেনেথ কাউন্ডা- জাম্বিয়ার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নায়ক

কেনেথ কাউন্ডা তার অহিংস নীতির জন্য আফ্রিকার গান্ধী নামেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে

Leave a Reply