#গল্প
কিশোর গ্যাং
আফছানা খানম অথৈ
অপ্রতিম বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বয়স মাত্র তেরো বছর। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বাবা-মা দুজনই বিসিএস ক্যাডার। অর্থের কোনো অভাব নেই তাদের সংসারে।
একমাত্র ছেলেকে ঘিরেই তাঁদের যত স্বপ্ন।তাঁরা ভাবেন, একদিন অপ্রতিমও বড় হবে, বিসিএস ক্যাডার হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে।ছেলের কোনো আবদারই তাঁরা অপূর্ণ রাখেননি। অপ্রতিম যা চেয়েছে, তাই পেয়েছে।সেদিন দুপুরে অপ্রতিম মায়ের কাছে এসে বলল,
—মা, তোমার আইফোনটা একটু দাও না।
মা অবাক হয়ে বললেন,
—কেন বাবা?
—বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাব। ছবি তুলব। একটু ঘুরবও।
মা মুচকি হেসে বললেন,
—বেশি দূরে যেও না। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে এসো।
—ঠিক আছে মা। চিন্তা করো না।
মা নিজের আইফোনটি ছেলের হাতে তুলে দিলেন।অপ্রতিম আনন্দে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।তার বন্ধু তুহিন তাকে সালন্দা পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সেখানে আরও কয়েকজন ছেলে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিল।সবাই মিলে ছবি তুলতে লাগল। কেউ সেলফি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে। অপ্রতিমও হাসিমুখে ছবি তুলছিল।সে বুঝতেই পারেনি, তার চারপাশে থাকা কয়েকজন বন্ধুর চোখে তখন অন্য হিসাব চলছে।একসময় তুহিন বলল,
—অপ্রতিম, ফোনটা একটু দে তো।
—কেন?
—দে না, একটা ছবি তুলব।
অপ্রতিম ফোন এগিয়ে দিতে গেলে তুহিন ফোনটি নিয়ে বলল,
—এখন থেকে ফোনটা আমাদের কাছে থাকবে।
অপ্রতিম অবাক হয়ে গেল।
—মানে?
—মানে, ফোনটা আমাদের দিয়ে দে।
—কিন্তু এটা আমার না। মায়ের ফোন। আমি দিতে পারব না।
তুহিনের চোখ হঠাৎ রাগে লাল হয়ে উঠল।
—দিবি না?
—না। তোরা চাইলে আমি বাসায় গিয়ে কথা বলব।
তুহিন দাঁত চেপে বলল,
—তুই অনেক কথা বলিস!
কথা শেষ করেই সে পাশে পড়ে থাকা একটি লাঠি তুলে নিল।
অপ্রতিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই,সজোরে আঘাত!
লাঠিটি গিয়ে পড়ল তার মাথায়।
—আহ্!উঁহু!
অপ্রতিম মাটিতে পড়ে গেল।সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—তুহিন, আমাকে মারিস না। ফোনটা নিয়ে যা।
কিন্তু তুহিন থামল না।আরেকটি আঘাত এসে পড়ল অপ্রতিমের শরীরে।অপ্রতিম দুই হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করল।
—আমি তোদের কিছু বলব না। প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দে…
কিন্তু তার সেই আকুতি কারও হৃদয় নরম করল না।
সে আবার বলল,
—আমার প্রাণ ভিক্ষা দে… আমাকে আর মারিস না।
অপ্রতিমের কণ্ঠ কাঁপছিল।তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছিল।সে আবার বলল,
—তোদের একটা কেন, পাঁচটা আইফোন দেব। তবুও আমাকে মারিস না। আমাকে বাঁচতে দে।
কিন্তু তুহিনের চোখে তখন লোভ আর হিংস্রতা।সে আবার লাঠি দিয়ে আঘাত করল।অপ্রতিমের চিৎকারে যেন পাহাড়ি এলাকার নীরবতা কেঁপে উঠল।
—মা…!
শেষবারের মতো মায়ের কথা মনে পড়ল তার। মা বলেছিলেন,
“সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে এসো।”
অপ্রতিম মনে মনে বলল,
“মা, আমি তো ফিরতে চেয়েছিলাম…”কিন্তু আর ফেরা হলো না।
একসময় অপ্রতিম নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল।তুহিন ও তার বন্ধুরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত হলো, অপ্রতিম আর নড়ছে না।তুহিন বলল,
—চল, এখান থেকে চলে যাই।
একজন বলল,
—ও যদি বেঁচে থাকে?
তুহিন ঠান্ডা গলায় বলল,
—চুপ কর।ও মরে গেছে।এবার চল ফেরা যাক।
তারা অপ্রতিমকে সেখানে ফেলে রেখে চলে গেল।তুহিন সঙ্গে করে নিয়ে গেল সেই আইফোনটি।অন্যদিকে বাসায় তখন অপ্রতিমের মা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামছে।তিনি ছেলেকে ফোন করলেন।ফোন বন্ধ।আবার করলেন।তবুও বন্ধ।মায়ের বুকের ভেতর কেমন যেন অজানা ভয় জমতে লাগল।
তিনি স্বামীকে বললেন,
—শুনছেন, অপ্রতিমের ফোন বন্ধ কেন?
বাবা বললেন,
—হয়তো চার্জ শেষ হয়ে গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে আছে। চলে আসবে।মা মাথা নাড়লেন।
—না। আমার মনটা কেমন যেন করছে।
কিছুক্ষণ পর তিনি তুহিনকে ফোন করলেন।
—বাবা, অপ্রতিম কি তোমাদের সঙ্গে ছিল?
তুহিন স্বাভাবিক গলায় বলল,
—জি আন্টি, একটু আগে ছিল।
—এখন কোথায়?
—জানি না আন্টি। ও হয়তো অন্য কোথাও গেছে।
মা বললেন,
—তুমি কি নিশ্চিত?
—জি আন্টি। আপনি চিন্তা করবেন না। ও বাসায় চলে আসবে।
কিন্তু মায়ের মন কিছুতেই মানল না।তিনি স্বামীকে বললেন,
—চলো আমরা ওকে খুঁজতে বের হই।শুরু হলো খোঁজ।
একজনের পর একজনকে ফোন করা হলো।বন্ধুদের বাসায় খোঁজ নেওয়া হলো।রাস্তায় খোঁজা হলো।কেউ অপ্রতিমের কোনো সন্ধান দিতে পারল না।শেষ পর্যন্ত বাবা-মা থানায় গিয়ে ছেলের নিখোঁজের ডায়েরি করলেন।
রাত আরও গভীর হলো।মা থানার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—স্যার, আমার ছেলেকে খুঁজে দিন। আমার একটাই ছেলে। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না।
পুলিশ আশ্বস্ত করল,
—আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
কিন্তু মা জানতেন না, তার ছেলে তখন আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না।
আর ঠিক সেই সময়…সালন্দা পাহাড়ি এলাকার নির্জন জায়গায় কয়েকজন মানুষ অপ্রতিমের নিথর দেহ দেখতে পেলেন।তারা পুলিশকে খবর দিলেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেল পুলিশ।
পুলিশ যখন অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে, তখনও তার বাবা-মা জানতেন না—তাঁদের একমাত্র সন্তান আর পৃথিবীতে নেই।কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাঁদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গেল।মা ছেলের মুখ দেখেই চিৎকার করে উঠলেন,
—অপ্রতিম!
তিনি ছেলের নিথর শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
—বাবা, তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবি। তাহলে এভাবে ফিরলি কেন?
কেউ কোনো উত্তর দিতে পারল না।মা ছেলের মাথায় হাত রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—তুই তো আমার কাছে আইফোন চাসনি বাবা। তুই শুধু একটু ঘুরতে যেতে চেয়েছিলি। আমি কেন তোকে যেতে দিলাম?
বাবা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও সেই মুহূর্তে তিনি অসহায় এক বাবা।নিজের চোখের সামনে সন্তানের লাশ—এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?এরপর শুরু হলো তদন্ত।
পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করল।
ফুটেজে দেখা গেল, অপ্রতিম বাসা থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর সাদা শার্ট পরা একটি ছেলে তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে।পুলিশ ফুটেজটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে ছেলেটিকে শনাক্ত করল।সে আর কেউ নয়—তুহিন।
অপ্রতিমদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে সে।পুলিশ দ্রুত তুহিনকে আটক করল।জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো।
—অপ্রতিমের সঙ্গে তুমি কোথায় গিয়েছিলে?
—কোথাও না।
—সিসিটিভিতে তোমাকে দেখা গেছে।
তুহিন চুপ।পুলিশ আবার বলল,
—সত্যি কথা বলো। অপ্রতিমকে কী করেছ?
তুহিন এবারও চুপ রইল।কিছুক্ষণ পর তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল,
—আমি ওকে মারতে চাইনি।
পুলিশ জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে কী হয়েছিল?
তুহিন মাথা নিচু করে বলল,
—আমরা শুধু ফোনটা নিতে চেয়েছিলাম।
—তারপর?
—ও দিতে চায়নি।
—তাই বলে তাকে মেরে ফেললে?
তুহিন কোনো উত্তর দিল না।পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে একপর্যায়ে সে সবকিছু স্বীকার করল।সে জানাল, তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। তারা অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। অপ্রতিম বাধা দেওয়ায় তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়।তারপর সে মারা গেল।
পুলিশ বলল,
—আইফোন কোথায়?
তুহিন বলল,
—আমার বাসায়।
পুলিশ তুহিনের বাসায় গিয়ে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করল।তদন্ত যত এগোতে লাগল, ততই ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে আসতে লাগল।পুলিশ জানতে পারল, তুহিন একা নয়।সে একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত।তারা এর আগেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়েছে।কিছুদিন আগে তারা একটি মোটরসাইকেলও ছিনতাই করেছিল।পুলিশ কর্মকর্তার চোখে তখন উদ্বেগ।তিনি বললেন,
—এই বয়সে ছেলেগুলো এমন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে কীভাবে?
একজন কর্মকর্তা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ—সব জায়গাতেই আমাদের আরও সচেতন হতে হবে।কারণ একজন কিশোর অপরাধী হয়ে জন্মায় না।তাকে ধীরে ধীরে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয় কিছু ভুল পরিবেশ, ভুল বন্ধুত্ব, ভুল শিক্ষা এবং অনেক সময় পরিবারের অসচেতনতা।কিন্তু অপ্রতিমের পরিবারের জন্য এসব কথা তখন কোনো সান্ত্বনাই নয়।তাঁদের কাছে একটাই সত্য—তাঁদের একমাত্র সন্তান আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর তার বাবা-মায়ের জীবনে যেন নেমে এলো অন্ধকার।বাড়ির প্রতিটি ঘরে ছেলের স্মৃতি।টেবিলের ওপর পড়ে আছে তার বই।বিছানায় পড়ে আছে স্কুলের পোশাক।দেয়ালে ঝুলছে তার হাসিমুখের ছবি।মা ছেলের ঘরে গিয়ে বসে থাকেন।কখনো বই হাতে নিয়ে বলেন,
—বাবা, তুই তো বলেছিলি বড় হয়ে অনেক বড় মানুষ হবি। তোর বইগুলো এখন কার জন্য?
কোনো উত্তর আসে না।শুধু নীরবতা।অপ্রতিমের গল্পটি আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা।একটি সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, দামি পোশাক পরানো, ভালো খাবার খাওয়ানো কিংবা তার সব আবদার পূরণ করাই বাবা-মায়ের দায়িত্বের শেষ নয়।সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে।তার কথা শুনতে হবে।সে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।সন্তান যখন বলবে,
—বাবা, আমাকে টাকা দাও।
শুধু টাকা হাতে তুলে না দিয়ে জিজ্ঞেস করুন,
—কী করবে টাকা দিয়ে?
যখন বলবে,
—আমি বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাব।
বলুন,
—কোথায় যাবে? কারা যাবে? কখন ফিরবে?
এসব প্রশ্ন শাসন নয়।এসব হলো সন্তানের প্রতি দায়িত্ব।
অপ্রতিমের মা হয়তো কোনোদিন ভাবেননি, নিজের হাতে দেওয়া একটি আইফোনই একদিন তাঁর সন্তানের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।তবে এখানে ফোনটি আসল কারণ নয়।আসল সমস্যা ছিল অপরাধী মানসিকতা, ভুল বন্ধুত্ব এবং অপরাধের প্রতি ভয় হারিয়ে ফেলা।তাই সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখাই সমাধান নয়; বরং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো জরুরি।
তাকে বোঝাতে হবে—লোভের পরিণতি কী।অপরাধের পরিণতি কী।খারাপ বন্ধুর পরিণতি কী।একটি ভুল সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি পরিবারকে সারাজীবনের কান্না উপহার দিতে পারে।আজকের কিশোরই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
তারা যদি সঠিক পথে না হাঁটে, তাহলে আগামী দিনে দেশের হাল ধরবে কে?
তাই সময় থাকতে সন্তানকে সঠিক পথ দেখান।তাকে ভালোবাসুন, কিন্তু অন্ধ প্রশ্রয় দেবেন না।তার প্রয়োজন পূরণ করুন, কিন্তু সব আবদার পূরণ করার মধ্যে ভালোবাসার প্রমাণ খুঁজবেন না।সন্তানের হাতে শুধু দামি মোবাইল নয়—ভালো শিক্ষা তুলে দিন।তার পকেটে শুধু টাকা নয়—নৈতিকতার শক্তি দিন।তার পাশে শুধু বাবা-মা হিসেবে নয়—একজন বন্ধুর মতো দাঁড়ান।
কারণ একটি সন্তানকে কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি পরিবারকে রক্ষা করা নয়; একটি ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
পরিবার পাবে আদর্শ সন্তান।সমাজ পাবে একজন সুনাগরিক।আর দেশ পাবে তার ভবিষ্যতের যোগ্য মানুষ।
ঃসমাপ্তঃ
