ছায়ার আড়ালে
অধ্যায় ১: প্রথম ভুল বোঝাবুঝি
বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছিল মেঘে। ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন শিক্ষার্থীদের কোলাহল, পরিচিত-অপরিচিত মুখ, আর ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্ন।
সায়রা চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিল।
“আজ থেকে নতুন জীবন…”—নিজেকে বলল সে।
কিন্তু তার ভেতরের ভয়টা কোথাও যায়নি।
সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের শেষ কথাটা এখনও কানে বাজছে—
“তুই কোনো দিন আমাদের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবি না।”
এসব কথা সে ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে। তাই কারও সামনে নিজের মত প্রকাশ করার সাহস তার খুব কম।
বইগুলো শক্ত করে বুকে চেপে ধরে সে দ্রুত করিডোর দিয়ে হাঁটছিল।
ঠিক তখনই…
ধাক্কা!
সব বই মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
“আমি দুঃখিত…”
গভীর কিন্তু শান্ত কণ্ঠ।
সায়রা বিরক্ত হয়ে মাথা তুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা, সুশ্রী এক যুবক। কালো শার্ট, গম্ভীর চোখ, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত কোমলতা।
ছেলেটি নিচু হয়ে বইগুলো কুড়িয়ে নিতে লাগল।
“আপনি ঠিক আছেন?”
সায়রা বইগুলো প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
“আগে দেখে হাঁটতে পারেন না?”
ছেলেটি শুধু মৃদু হেসে বলল,
“ভুলটা আমারই হয়েছে। আবারও দুঃখিত।”
এরপর সে চলে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন ফিসফিস করে উঠল।
—”ওই তো আয়ান কায়সার।”
—”ওর থেকে দূরে থাকিস।”
—”দেখতে যত ভালো, আসলে ততটা না।”
—”গত সেমিস্টারেও ওর জন্য বড় একটা ঝামেলা হয়েছিল।”
সায়রা আর কিছু না শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
“ছেলেটা নিশ্চয়ই ভালো নয়।”
অন্যদিকে…
করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল আরেকজন।
সাদা শার্ট, চশমা, শান্ত মুখ, ভদ্র হাসি।
ওয়াহিদ কায়সার।
তার পাশে কয়েকজন জুনিয়র দাঁড়িয়ে।
একজন বলল,
“ভাই, আয়ান আবার ঝামেলা করল?”
ওয়াহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ও আসলে খারাপ না…”
একটু থেমে নিচু স্বরে বলল,
“কিন্তু ও নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই সবাই ওকে ভুল বোঝে।”
তার কথায় যেন আয়ানকে সমর্থনই করা হচ্ছে।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠল।
এমন হাসি, যা কেউ খেয়াল করল না।
দুপুরে প্রথম ক্লাস।
সায়রা খালি একটি সিটে গিয়ে বসল।
কয়েক মিনিট পর একজন এসে ভদ্রভাবে বলল,
“আমি কি এখানে বসতে পারি?”
সায়রা তাকিয়ে দেখল—
সকালের সেই ভদ্র ছেলেটি।
ওয়াহিদ।
“অবশ্যই।”
“ধন্যবাদ। আমি ওয়াহিদ কায়সার।”
“সায়রা চৌধুরী।”
“নতুন?”
“হ্যাঁ।”
ওয়াহিদ হালকা হেসে বলল,
“চিন্তা করবেন না। এই ডিপার্টমেন্টে কেউ যদি কোনো সমস্যায় পড়ে, আমি সাহায্য করি।”
সায়রা অবাক হলো।
এত ভদ্র মানুষও হয়?
ক্লাস শেষে ওয়াহিদ তাকে লাইব্রেরি, ক্যান্টিন, বিভাগ—সব ঘুরিয়ে দেখাল।
সায়রার মনে হলো—
“মানুষটা সত্যিই ভালো।”
সেদিন সন্ধ্যায়…
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি পরিত্যক্ত গুদামঘর।
অন্ধকারের মধ্যে কয়েকজন লোক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন।
অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না।
লোকগুলোর একজন কাঁপা গলায় বলল,
“স্যার… আয়ান আজ আবার একজনকে সাহায্য করেছে।”
নীরবতা।
তারপর ঠান্ডা কণ্ঠ—
“আগামীকাল থেকেই গুজব ছড়াবে…”
“যে সাহায্যটা করেছে, সেটাও নিজের স্বার্থে।”
“প্রমাণ?”
লোকটা জিজ্ঞেস করতেই অন্ধকারে দাঁড়ানো মানুষটি মৃদু হেসে বলল—
“প্রমাণ মানুষ বিশ্বাস করে না…”
“গল্প বিশ্বাস করে।”
লোকগুলো মাথা নত করল।
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো সেই মানুষটি।
সে আর কেউ নয়…
ওয়াহিদ কায়সার।
তার মুখে আগের মতোই শান্ত হাসি।
কিন্তু চোখে…
এক ফোঁটা আলোও নেই।
