ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসগুলো কি কি?

‘ইসলাম’ শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ এবং এই শব্দের উৎপত্তি আরবি শব্দমূল ‘সলম’ থেকে যার অর্থ শান্তি। ইসলামিক পরিভাষায় একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে শান্তি লাভ করার ধর্মকেই বলা হয় ইসলাম ধর্ম। একমাত্র আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস এবং মুহাম্মদ(সাঃ) কে সর্বশেষ বার্তাবাহক(স্রষ্টার) বলে মেনে নেয়াটা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। যারা এই ধর্ম অনুসরণ করে তাদেরকে বলা হয় মুসলিম।
যা যা থাকছে-

ধর্মগ্রন্থঃ একমাত্র কুরআনকেই মুলিমরা অবিকৃত ঐশী বাণী বলে বিশ্বাস করে। এছাড়া ধর্মপালনের জন্য হাদিসের অনুসরণ করে। হাদিসকে শুদ্ধ মনে করা হলেও কুরআনের মত বিশুদ্ধ এবং সংরক্ষিত মনে করা হয় না।

উৎপত্তিঃ মুহাম্মদ(সাঃ) ইসলাম প্রচার শুরু করেন তার নবুয়ত পাওয়ার পরে অর্থাৎ, ৪০ বছর বয়সে। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই ধর্মের প্রচার শুরু করেন, সেই হিসেবে বলতে পারেন তখন এই ধর্মের উৎপত্তি ঘটে।কিন্তু মুসলিমদের মতে সৃষ্টির শুরু থেকেই এটি আছে।

মূল বাক্যঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বঙ্গানুবাদ- কোন উপাস্য নেই, আল্লাহ ছাড়া। বুঝতেই পারছেন একেশ্বরবাদই এই ধর্মের মূল কথা।

ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক কে?

ইসলাম ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ৪০ বছর বয়স্ক মুহাম্মদ(সাঃ) এর প্রবর্তিত কোন ধর্ম নয়, এটি ধারাবাহিকতার অংশ(মুসলিমরা এটাই বিশ্বাস করে, অন্যদের বিশ্বাস আলাদা)। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম(আঃ) থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত অসংখ্য নবী মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য এসেছেন। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক আল্লাহ নিজেই। এই ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী-
  • আল্লাহ নিজের ইসলামের প্রবর্তক- পৃথিবীর প্রথম মানুষ এই ধর্মের অনুসারী ছিলেন
  • আদম(আঃ) বা, এডাম এই ধর্মের প্রথম নবী
  • ইসলাম হচ্ছে একেশ্বরবাদ যেখানে আল্লাহর সমকক্ষ বা, অংশ বলে আর কেউ বা, কিছু নেই
  • মুহাম্মদ(সাঃ) এই ধর্মের শেষ নবী যিনি সারা বিশ্বের জন্য এসেছেন, অন্য নবীরা তাদের জাতির জন্য তাদের সময়ে এসেছিলেন
পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে আল্লাহ রাসূল প্রেরণ করেছেন। সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবী হচ্ছেন- হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। ঈসা(আঃ)(যিশু), মূসা(আঃ)(মোজেস) এবং অন্যান্য নবীরা এক আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মেনে নেয়ার মাঝেই শান্তি খুজেছেন বলে মুসলিমরা বিশ্বাস করে।
সুতরাং ইসলাম ধর্মের মূলকথা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করা।

সাতটি বিষয়ের উপর বিশ্বাস(ঈমানে মুফাসসাল)

মুসলিমরা সাতটি বিষয়ে কোন শর্ত ছাড়াই বিশ্বাস করে, এর উপর ভিত্তি করে অন্যন্য বিষয়ে তারা যুক্তি দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করে

  1. আল্লাহঃ একক ও অন্যন্য। তার কোন মূর্তি, ছবি বা, প্রতিবিম্ব নেই। আল্লাহর বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষের পক্ষে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।
  2. ফেরেশতাঃ অসংখ্য ফেরেশতা রয়েছেন যারা আল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছেন। মানুষের মত তাদের ভালো-মন্দ কাজের ক্ষমতা নেই, শুধু আল্লাহর নির্দেশই তারা পালন করেন।
  3. রাসূলগণঃ মানুষের মধ্য থেকে বেছে নেয়া আল্লাহর প্রতিনিধি যারা, আল্লাহর বার্তা মানুষের কাছে পৌছে দেয়। কিতাবগুলো তাদের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে।
  4. কিতাবসমূহঃ রাসূলগণের কাছে জিব্রাইল ফেরেশতার মাধ্যমে আসা বাণী যা, বই আকারে পাওয়া যায়। মোট ১০৪ টি কিতাব সৃষ্টিকর্তা আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, যার মধ্যে চারটি বড়। শেষ কিতাব কুরআন হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর কাছে এসেছে।
  5. আখিরাতঃ মৃত্যু পরবর্তী জীবন যেখানে মানুষের এই জীবনের ভাল-মন্দ কাজের ভিত্তিতে বিচার করা হবে এবং পুরষ্কার বা, শাস্তি দেয়া হবে
  6. ভাগ্যের ভালো মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিতঃ মানুষ তার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। চেষ্টা করলে যেকোন কাজেই মানুষ সাধারণত সফলতা পায়।
  7. শেষ বিচারের দিন পুনরুত্থানের উপরঃ কিয়ামতের পর সব মানুষ আবার পুনরুত্থিত হবে। কিয়ামত হচ্ছে মহাপ্রলয়ের সময় যে সময় পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

 

আল্লাহ কে?

বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ
আল্লাহ একটি আরবি শব্দ। এই শব্দটি দিয়ে মুসলিমরা সমগ্র মহাবিশ্বের প্রতিপালক একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকে বোঝায়। তবে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী আরব খ্রিস্টানরা এই শব্দটিকে খ্রিস্ট ধর্মের ত্রিত্ববাদ বুঝাতেও প্রয়োগ করে থাকে। আল্লাহ আল আব, আল্লাহ আল ইবন এবং আল্লাহ আল কুদস  এই তিনটি বাক্যাংশের মাধ্যমে তারা পবিত্র পিতা, পবিত্র পুত্র এবং পবিত্র আত্মাকে বুঝিয়ে থাকে। পড়ুন- খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাস, উদ্ভব এবং বিশ্বাস
স্রষ্টাকে বুঝাতে বাহাই, ইহুদি এবং শিখদের কিছু গ্রুপ এই শব্দটি প্রয়োগ করে থাকে। ইসলামপূর্ব যুগের পৌত্তলিকরা এই শব্দ প্রয়োগ করে সৃষ্টিকর্তার ধারণায় অংশীবাদ যুক্ত করতো। লাত, উজ্জা এবং মানাতকে তারা মনে করত আল্লাহর তিন কন্যা। কুরআন এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মে অংশীবাদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে আল্লাহ কে তা জানতে কুরআনের সূরা ইখলাস পড়ুন। এই লেখায় আমরা সাধারণীকৃত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছি

সূরা ইখলাসের বঙ্গানুবাদঃ  বল, তিনিই আল্লাহ্ এক। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। তার সমতুল্য আর কেউ নেই।

আসমানি কিতাব

আসমানি কিতাব বলতে ইসলাম ধর্মে সেইসব গ্রন্থকে বুঝায় যা আল্লাহর কাছ থেকে মানুষের কাছে এসেছে। এই কিতাবগুলো সাধারণত রাসূলগণের কাছে জিব্রাইল(আঃ) নামক একজন ফেরেশতার মাধ্যমে এসেছে। এই কারণেই এগুলো ঐশী গ্রন্থ যা মানুষ রচনা করে নি।

মোট কিতাবের সংখ্যা

মোট আসমানি কিতাব ১০৪ টি। এর মাঝে চারটি হচ্ছে বড় গ্রন্থ এবং ১০০টি সহিফা। বড় গ্রন্থগুলো হচ্ছে-
কিতাবের নাম যার উপর অবতীর্ণ হয়েছে
তাওরাত মুসা(আঃ)
যাবুর দাউদ (আঃ)
ইঞ্জিল ঈসা (আঃ)
কুরআন মাজিদ মুহাম্মাদ(সাঃ)

পড়ুন- ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের পার্থক্য

কুরআনে ইব্রাহিম (আঃ) এর উপর সহিফা অবতীর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও এর সংখ্যা উল্লেখ করা হয় নি।  বাইবেল আর ইঞ্জিল এক নয়, তবে অনেকে গসপেলকে ইঞ্জিল বলে অভিহিত করেন।
ঈমানে মুফাসসাল অনুসারে এই কিতাবসমূহে বিশ্বাস করাটা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। ইসলাম ধর্ম নিয়ে লেখা আমাদের নিবন্ধ পড়লে এই সাতটি বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাবেন। তাওরাত বলতে ইহুদি তানাখের তোরাহ কে বুঝানো হয় আর যাবুর বলতে দাউদ(আঃ) এর উপর অবতীর্ণ কিতাবে বুঝায়।

ইসলাম ধর্মের স্তম্ভ

  1. বিশ্বাসের ঘোষণা (কালিমা বা, শাহাদাহ)
  2. বাধ্যতামূলক উপাসনা(নামাজ)
  3. বাধ্যতামূলক গরীব মানুষদের ধনীদের সম্পদ থেকে একটি ছোট অংশ দেয়া(যাকাত)
  4. রামাদান (রমজান) মাসে রোজা রাখা
  5. শারিরিক এবং আর্থিক সামর্থ্য থাকলে মক্কায় হজ্জ করা

মুসলিমদের মধ্যে ভাগ/ফেরকা/মাজহাব

এই ব্যাপারে কোন কিছু লিখবো না, একটি ছবি দেখাবো। আশা করি তাতে ভালো ধারণা পাবেন-
ছবির কৃতিত্বঃ Angelpeream, ছবিটি Creative CommonsAttribution-Share Alike 3.0 Unported লাইসেন্স এর আওতাভুক্ত।
একটি কথা উল্লেখ করা দরকার, সাধারণ মুসলিমরা এইসব মাজহাবের ধার ধারে না। যা শিখেছে তাই পালন করে, সেটা যে মাজহাবের আকিদাই হোক না কেন। এইসব মাজহাব থাকাটা এক দিক থেকে ভালো আবার, অন্য দিক থেকে খারাপ।
মন্দ দিক, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার মানুষের জীবনে অনেক অকল্যাণ যুগে যুগে বয়ে এনেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজেদের মতকে যারা ব্যবহার করেছেন তাদের মাঝে অনেক যুদ্ধের ইতিহাস আছে। এইসব(যুদ্ধবাজ) রাষ্ট্রনায়কেরা মতো শান্তিপ্রিয় ছিলেন না। কিন্তু মাজহাব যাদের নামে তৈরি হয়েছে তাদেরকে এরকম যুদ্ধ করতে দেখা যায় নি। তারা মনোনিবেশ করেছিলেন ধর্মপালনে।
মাজহাব এবং মাজহাববিরোধী মাজহাবের অন্ধ ভক্তদের প্রতি আমার অনুরোধ- আপনারা ধর্মপালনে মনোনিবেশ করুন, অন্যের আচরণ ভুল মনে হলে এবং পরিবর্তনের আকাঙ্খা থাকলে শান্তি বজায় রেখে আলোচনা করুন(আপনিও ভুল হতে পারেন এই সত্য স্বীকার করুন)।
ভালো দিক, মত প্রকাশের অধিকার। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলো মেনে নিয়ে নানারকম মত প্রকাশ করা যায় তাঁর নিদর্শন এই মাজহাবগুলো। বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তিরা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন এবং তাদের অনুসারীরা সেগুলো অনুসরণ করতে এই ভাগগুলো তৈরি করেছেন। ইসলামী আলেমরা অনেকে এগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে ইসলামের অবশ্য পালনীয় বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেন।
আরো পড়ুনঃ ধর্ম মানে কি?
তথ্যসূত্রঃ
(Visited 1 times, 1 visits today)
এডমিন
Author: এডমিন

বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করছি

likeheartlaughterwowsadangry
0

Related Posts

নবীজির অঙ্গীকারনামা

খ্রিস্টান সন্যাসীদের প্রতি নবীজির অঙ্গীকারনামা একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সমাদৃত। পৃথিবীর প্রাচীনতম গীর্জাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে সেইন্ট ক্যাথরিনের গীর্জা। সিনাই

যিশু খ্রিস্টের জন্ম ও অন্যান্য

যিশুকে বলা হয় নাজারাথের যিশু। খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীরা তাকে ঈশ্বরের পুত্ররূপী ঈশ্বর এবং মেসিয়াহ মনে করেন। তিনিই খ্রিস্ট ধর্মের কেন্দ্রীয়

নাস্তিকতাবাদ বা, নাস্তিক্যবাদ আসলে কেমন?

নাস্তিকতাবাদ বলতে আমরা এমন মতবাদকে বুঝি যেখানে ঈশ্বরের বা, কোন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না। এর বাইরে আরো কতগুলো

Leave a Reply