টাকা কথন

টাকা কথন

ছোট বেলায় হয় পাতা নতুবা কাগজ কে টাকা বানিয়ে ‘ক্রেতা – বিক্রেতা’ খেলাটা খেলেনি এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। ভাবতো, “পাতা অথবা কাগজ যদি হতো টাকা, কি মজাই না হতো জীবনটা”।

রূপকথার গল্প- টাকার গাছ

‘টাকার গাছ’ নামে একটি রুপকথার গল্প পড়ে ভেবেছিলাম সত্যিই হয়তো টাকা রোপন করলে গাছ হবে। গোপনে এক টাকা নিয়ে মাটিতে গর্ত করে রেখে ও এসেছিলাম। মাঝে সাঝে গিয়ে দেখতাম – টাকার গাছ হলো কিনা? না! আশায় গুঁড়েবালি। তখনকার ভাবনায় ছিল, টাকা দিয়ে বেশি বেশি চকলেট, চুইংগাম, আইসক্রিম কেনা।

মূলত জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই সবাই বুঝে টাকার প্রয়োজনীয়তা। সেই সময় প্রতি কোরবানি ঈদে টিভিতে নাট্যকার আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় ‘জব্বর আলির ঈদ’ নামক একটা নাটক দেখাতো। সেই নাটকে অভিনেতা ফরিদ আলি গৃহকর্তা জব্বর আলির পা ধরে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেছিল, “” টাকা দ্যান। ডুবাই (দুবাই) যামু। টাকা আমার আব্বাজান। টাকা আমার আম্মাজান…”।

টাকা মধুর চেয়ে মিষ্টি

আমি সম্ভবত স্কুলে পড়তাম তখন। ঠিক মনে নেই। আমাদের কাজের মেয়েটা খুব মজা পেয়েছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ,

আহারে! টাকার লাই হেতে হাগল হই গেছে। আফা, এই টাকার লাই ই তো ব্যাক কিছু। মা বাপ ছাড়ি কাম ও কইরতাম আইছি টাকার লাই“।

টাকা নিয়ে অনেক প্রবাদ ও আছে — “ টাকায় কি না হয়”? ” টাকায় বাঘের দুধ ও মিলে“। “অর্থই অনর্থের মূল”। “Money is sweeter than honey“. বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, “যার টাকা আছে তার কাছে আইন খোলা আকাশের মতো। যার টাকা নেই তার কাছে আইন মাকড়শার জালের মতো”।সমাজে টাকাওয়ালাদের কর্মকান্ডে উক্তিটির সত্যতা মিলে।

ফেসবুকে টাকা

এক টাকাওয়ালা তার আরেক টাকাওয়ালা শত্রুর চেহারায় কুকুরের ছবি বসিয়ে নানা আপত্তিকর কমেন্ট করে ফেইসবুকে পোস্ট দিল। সেই এলাকারই সাধারণ এক দিনমজুরের কিশোর ছেলে মজা পেয়ে পোস্টটি শেয়ার করায় স্থানীয় এক মেম্বার ঐ কিশোর ছেলেকে হুমকি দিয়ে ঘরছাড়া করল। ছেলেটির বাবা মামলা করল কিছু স্থানীয়দের পরামর্শে। উকিল খরচ সহ আনুষঙ্গিক খরচাদি সামলাতে গিয়ে শুরুতেই তার কাহিল অবস্থা। অবশেষে মামলা উঠিয়ে সুদে নেয়া টাকা মেম্বারকে দিয়ে আপোষের মাধ্যমে সুরাহা করল ঐ অসহায় পরিবার। হায়! বিচারের বাণী নির্ভৃতে কাঁদে!

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ববিখ্যাত ধনী বিল গেটস বলেছিলেন,

“যখন তোমার পকেট ভর্তি টাকা থাকবে তখন শুধুমাত্র তুমি ভুলে যাবে – তুমি কে? কিন্তুু যখন তোমার পকেট ফাঁকা থাকবে তখন সমস্ত দুনিয়া ভুলে যাবে – তুমি কে?”

তবে আমার মনে হয় বৈধ ভাবে কষ্টার্জিত টাকার মালিকগণ সহজে নিজের অতীত ও অবস্থান ভুলতে পারে না।

টাকার সাথে দাম্ভিকতার সম্পর্ক

অপরদিকে যারা অবৈধ পথে টাকা উপার্জন করেছেন তারা বিবেকহীন অমানুষে পরিণত হয়ে ভুলে যান নিজের মানবীয় অস্তিত্বকে। অফুরন্ত সম্পদ ভুলিয়ে দেয় তাদের আমিত্বকে। এ ধরনের একজনের wife বলেই ফেলল, সাগরের পানি শুকিয়ে যাবে অথচ তার স্বামীর টাকা নাকি কখনো ফুরিয়ে যাবে না। কি দাম্ভািকতা! এ ই চলছে বর্তমানে। নেই কোন পরিতাপ। সীমিত আয়ধারী একজন আফসোস করে বলল, সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়ে ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারছি না। সীমিত আয়ে সীমিত খরচে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।

টাকা নিয়ে একটি কৌতুক

প্রসঙ্গত একটি কৌতুক মনে পড়ল। এক সীমিত আয়ের লোক তার ছোট ছেলেকে জুতা কিনে দিল। জুতার তলা যেন ক্ষয়ে না যায় সেজন্য ছেলেকে বললেন দুই সিঁড়ি টপকে উপরে উঠতে। কিন্তু ছেলে না বুঝে আরেক ধাপ উপরে উঠে তিন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। ক্ষিপ্ত বাবা দিলেন ছেলের গালে জোরে চড় কষিয়ে। ছেলের চীৎকারে পাশের ফ্লাটের মহিলা এগিয়ে এসে বললেন, “এটুকু বাচ্চাকে মারলেন কেন? ও তো ঠিকই করেছে”। বাবা বললেন,

আর বলবেন না। ২০০ টাকার জুতার তলা বাঁচাতে গিয়ে ৮০০ টাকার প্যান্টের তলা ছিঁড়ে ফেলেছে“।

লোকটি যেমন জুতার স্থায়িত্ব নিয়ে চিন্তিত তেমনই সারাক্ষণ সংসারের আয় ব্যয়ের হিসাব নিকাশেই দিন কাটাতে হয় এ ধরনের সীমিত উপার্জনকারী পরিবারকে। অথচ স্বল্প শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকে চাটুকারিতার জোরে ঘরে বসেই আয় করে লক্ষ লক্ষ টাকা। বড় ভাই এর মাধ্যমে চাকুরী পাইয়ে দিবে কিংবা কাজ টি পাইয়ে দিবে — এই আশ্বাস দিয়ে অথবা ভয় দেখিয়ে চলে তাদের টাকা উপার্জনের মিশন। অবৈধ টাকায় চলে তাদের ফুটানিগিরি। আত্মীয় স্বজনের কাছে ও ” টাকা” মূল্যায়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিয়েবাড়ির অভিজ্ঞতা

এক পরিচিত মধ্যবিত্ত ঘরানার আন্টি তার অভিজ্ঞতার কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বড় বোনের ছেলের বিয়েতে তার বড়লোক মোজবোন সহ তিনি গিয়েছিলেন। ওখানে শুধু আপন বোন ছাড়া আর সবার সমাদর বড়লোক বোনটিকে নিয়েই। এমনকি বোনের ছেলে ও মেজো খালার তদারকিতে ব্যস্ত। কতক্ষণ পরপর জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘”মেরে খালাম্মা মেরে জান”। অথচ উনার দিকে কেউ তাকিয়ে ও দেখছে না। পুরো প্রোগ্রামেই ঐ আন্টি নিস্প্রভ ছিলেন।

টাকা না থাকাটা ও যেন অপরাধ। স্যার টমাস ব্রাউন বলেছিলেন,

“অর্থ যেখানে নাই, ভালোবাসা সেখানে দুর্লভ”।

টাকার কি ক্ষমতা! টাকার কাছে অনেকে বিক্রি করে দেয় তাদের আজন্মলালিত সোহাগ, তাদের সুন্দর জীবন, তাদের নিরপরাধ জীবনের অনেকটা সময়।

বঙ্গবন্ধু ও সবজি বিক্রেতা

একবার ধানমন্ডির ৩২ নং ফ্লোরের ২য় তলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফোনে কথা বলার সময় কেয়ার টেকার এসে খবর দিল যে, এক সবজিওয়ালা তার জন্য সবজি নিয়ে এসেছে। তিনি সবজি রেখে সবজিওয়ালাকে দেয়ার জন্য ২০ টাকা কেয়ার টেকারের হাতে দিলেন। কিছুক্ষণ পর ঐ সবজিওয়ালা দৌড়ে দোতলায় উঠে বললেন, ” জনাব, আমার ক্ষেতের প্রথম সবজি আপনার জন্য নিয়ে এসেছি, বিক্রি করতে আসিনি”। এই বলে সে বঙ্গবন্ধুকে ১০ টাকা ফেরত দিল। বঙ্গবন্ধু বললেন, তোমাকে দিয়েছিলাম ২০ টাকা, তুমি যে ফেরত দিলে ১০ টাকা।

সবজিওয়ালা বলল,”কেয়ার টেকার সাহেব আমাকে ১০ টাকা ই দিয়েছিলেন“। হতবাক বঙ্গবন্ধু আফসোস করে বললেন,”

যে দেশে ২০ টাকা দোতলা থেকে নীচ তলায় নামতে নামতেই ১০ টাকা হয়ে যায় সে দেশে কত হাজার কোটি টাকার বাজেট করলে সাধারণ জনগন তা পাবে?” কি নিদারুন জনদরদী উক্তি! কয়জন ভাবে এমন করে জনগনের কথা! জনগন আর কিছু নেতার মাঝে “টাকার মোহ” নামক একটি প্রতিবন্ধক আছে — যার কারণে তৈরি হয় দূরত্ব।

টাকা দিয়ে কি সুখ বা, সাস্থ্য কেনা যায়?

কিন্তুু এ পৃথিবীতে কিছু সাদা মনের, নিলোর্ভী মানুষ আজো আছে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। প্রয়োজনাতিরিক্ত টাকা তাদেরকে আকৃষ্ট করে না। তাদের কাছে টাকা আবশ্যক তবে অতি আবশ্যক নয়। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ল। এক ধনী লোক প্রতিদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতো এক মুচি মনের সুখে গান গাইতে গাইতে তার কাজ করছে

লোকটি অবাক হয়ে ভাবল, এতো টাকার মালিক হয়ে ও কখনো মনের সুখে আমি এমন গান গাইতে পারছি না। অথচ এই সামান্য মুচির মনে এতো সুখ! সে মুচিকে এক বস্তা টাকা দিল। মুচি তো খুশী। এতো টাকা সে কখনো চোখে দেখেনি। সে একটা গর্তে বস্তাটা লুকিয়ে রাখল। শুরু হলো তার দুশ্চিন্তা। সারাক্ষণ তার মনে হতো কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে টাকাগুলো। তটস্থ মন। ঘুম ও যেন চলে গেছে তার চোখ থেকে। তিনদিন পর সে টাকার বস্তাটি ঐ বড়লোক ভদ্রলোটিকে ফেরত দিয়ে বলল, ” আমার আগের জীবনই ভালো। টাকার কারণে আমার শান্তি চলে গেছে”।

চীনের হারবিন প্রদেশের হাসপাতালের ছবি
চীনের হারবিন প্রাদেশিক হাসপাতালের ছবি

যারা মনে করে, Money is the second god of the world. তাদের উদ্দেশ্যে সত্যিকারের একটি ঘটনা তুলে ধরছি। মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত এক ধনাঢ্য চীনা মহিলা প্রচুর টাকা দেখিয়ে ডাক্তারকে বলল, এ টাকাগুলোর বিনিময়ে তার জীবন বাঁচিয়ে দিতে। ডাক্তার বুঝালেন, টাকা দিয়েই সব হয় না। তার ক্যান্সার চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। ডাক্তারের আর কিছুই করার নেই। শুনে রাগান্বিত ও হতাশ হয়ে টাকাগুলো ছুঁড়ে মারলেন।

মহিলাটি বললেন, টাকার দরকারটা কি? টাকার দরকারটা কি? টাকা দিয়ে স্বাস্হ্য কেনা যায় না। টাকা দিয়ে সময় কেনা যায় না। টাকা দিয়ে জীবন কেনা যায় না
টাকা আমাদের জীবনের অনেককিছু, সবকিছু নয়।

করোনাকালে ও দেখেছি, অনেক সম্পদশালী তাদের জীবন হারিয়েছেন টাকা খরচ করা সত্ত্বেও। এই টাকার পিছনে ন্যায় নীতি বিসর্জন দিয়ে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতেই থাকে অনেকে। একসময় তার টাকাই প্রাধান্য পায় আপনজনদের কাছে, সে নয়। তাই সময় থাকতেই সচেতন হতে হবে। টাকা উপার্জন করতে গিয়ে নিজের মূল্যবান সময় ও জীবন যেন অন্ধকার গহবরে হারিয়ে না যায়।

লিখেছেন- ফয়জুন্নেসা জেসমিন
আইনান, ঈশা, ওয়াফি এবং জিহানের মা,
অর্থনীতির প্রভাষক। 

(Visited 108 times, 1 visits today)
2
likeheartlaughterwowsadangry
0

Related Posts

ধর্ষণের জন্য দায়ী কে

ধর্ষণের জন্য কী আসলেই নারীর পোশাক দায়ী?

অভিযোগ: নারীদের পোশাক দ্বারা প্রভাবিত/তাড়িত হয়ে পুরুষেরা নারীদের,শিশুদের ও পশুপাখিদের ধর্ষণ করে। উত্তর: আপনি কোনো কিছু দ্বারা তাড়িত হয়ে কোনো
সৃজনশীল শিল্পকর্ম

বড়শিবিদ্ধ সৃজনশীলতা

ঘটনাটি দু' বছর আগের। একদিন হঠাৎ ছেলে মেয়েদের পিঠে খাওয়ার ইচ্ছে হল। আমার স্টকে থাকা পিঠে তৈরির রেসিপি অনুযায়ী সব

হয়তো…….

কতবার মেলেছি দু-নয়ন ধরা দেয়নি সে ধরা দেয়নি হয়ত আমি বুঝিনি বোঝার হয়ত বয়স হয়েছিলো না বারবার সে আঘাত করে

কবিতা – ভালোবাসার অনুভূতি

ভালোবাসার অনুভূতি  -- আলী সোহেল -- আবার দেখা হলে চোখে চোখ রেখে বলবো ভালোবাসি। সেদিনের সেই অনুভূতি গুলো মনের কোনে

One Reply to “টাকা কথন”

  1. টাকা নিয়ে চমৎকার একটি লেখা। এমন কোন কাজ নেই যা মানুষ টাকার জন্য না করে। করোনার এই দুর্যোগ পার করে আশা করি মানুষের বোধোদয় হবে।

Leave a Reply